এনসিএমইসি’র তথ্য
শিশু যৌন নিপীড়নে শীর্ষ পাঁচে বাংলাদেশ
Advertisement
আসাদুল্লা লায়ন
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন নিয়ে উদ্বেগ ছিল আগেই। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেড চিলড্রেনের (এনসিএমইসি) বাংলাদেশ নিয়ে সর্বশেষ তথ্য আরও উদ্বেগজনক। শিশু যৌন নির্যাতন বন্ধ, শিশু পর্নোগ্রাফি নির্মূলসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করা এনসিএমইসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সাত বছরে বাংলাদেশে ৯৫ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি শিশু নিপীড়নের রিপোর্ট জমা পড়েছে। এসব তথ্য পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের কাছেও। তবে এর ভিত্তিতে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় ৯৬ লাখ রিপোর্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। তথ্যগুলো যাচাই করে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বোপরি এটি অনলাইন শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে এনেছে।
সাত বছরে ঝুঁকিপূর্ণ আরও চার দেশের মধ্যে ভারতে এই রিপোর্টের সংখ্যা দুই কোটি ৮১ লাখ ৯৮ হাজার, ফিলিপাইনে এক কোটি ৩৪ লাখ ৩৮ হাজার, পাকিস্তানে এক কোটি তিন লাখ ৪৭ হাজার, ইন্দোনেশিয়ায় এক কোটি এক লাখ ২৩ হাজার।
প্রসঙ্গত, এনসিএমইসি শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করে। বিশ্বব্যাপী ফেসবুক, গুগল, মাইক্রোসফট তাদের নেটওয়ার্কে শিশুদের যৌনকাজে ব্যবহার, যৌন নিপীড়ন-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য এই প্রতিষ্ঠানকে জানায়। দুটি ধাপে এনসিএমইসি এসব তথ্য সংগ্রহের পর সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পাঠায়। অধিকাংশ রিপোর্টেই অভিযুক্তকে শনাক্তের পর্যাপ্ত তথ্য যুক্ত থাকে।
এনসিএমইসির তথ্য বিশ্লেষণ করেছে যুগান্তর। দেখা গেছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে এসংক্রান্ত প্রতিবেদনের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৯১ হাজারের বেশি। আগের বছর ছিল ২১ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রিপোর্ট বেড়েছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। ২০২৩ সালের তালিকায় ভারত ও ফিলিপাইনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান ছিল। তবে ২০২৪ সালে রিপোর্ট নেমে আসে ১১ লাখে এবং ২০২৫ সালে তা আরও কমে ছয় লাখ ৯৭ হাজারের মতো হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কমে আসা দেশের শিশু যৌন নিপীড়ন কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসাবে দেখা হয় না। এনসিএমইসির রিপোর্টিংয়ের ওঠানামার সঙ্গে প্রযুক্তিগত, নীতিগত এবং প্ল্যাটফর্মভিত্তিক পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে।
এর আগে ২০১৯ সালে জমা হয় পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪২টি রিপোর্ট। ২০২০ সালে তা বেড়ে হয় আট লাখ ১৭ হাজার ৬৮৭ এবং ২০২১ সালে ১৭ লাখ ৪৩ হাজার ২৪০টি। এই সাত বছরের সংখ্যাগুলো যোগ করলে দাঁড়ায় ৯৫ লাখ ৬৪ হাজার ৩০৪টি। এই সংখ্যা সব দেশের সাত বছরের ১৭৮ মিলিয়নের তুলনায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
তবে এনসিএমইসিতে আসা প্রতিটি রিপোর্টকে সরাসরি অপরাধ বা ভুক্তভোগী হিসাবে গণ্য করা যায় না। জনসাধারণ এবং ইলেকট্রনিক সার্ভিস প্রোভাইডাররা সন্দেহজনক হিসাবে রিপোর্ট করতে পারে। তবে তদন্তের পরই প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। আবার এর সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের রিপোর্টিং ব্যবস্থা, প্রযুক্তি কোম্পানির শনাক্তকরণ সক্ষমতার বিষয়ও রয়েছে। ফলে কোনো দেশের ওপর রিপোর্ট বেশি হওয়া মানেই ওই দেশে একই অনুপাতে শিশু যৌন নির্যাতন বেশি ঘটছে-এমন সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না।
বাংলাদেশের ব্যাপারে অস্বাভাবিক প্রতিবেদন উঠে এলেও প্রকৃত সংখ্যা পাওয়া যায়নি। কারণ এই তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে অল্প কিছু অভিযান চালিয়ে জড়িতদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বড় অংশ নিয়েই তদন্ত করা হয়নি। এনসিএমইসি থেকে সরাসরি তথ্য পায় পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত বা গ্রেফতার করার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন মঙ্গলবার জানান, এনসিএমইসি থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে সিআইডি কাজ করে থাকে। তিনি সংশ্লিষ্ট ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তবে সিআইডির মিডিয়া শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ তাৎক্ষণিক কোনো তথ্য দিতে পারেননি। পরে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে এ ক্ষেত্রে তিনটি চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শিশু যৌন নিপীড়ন বা পর্নোগ্রাফি-সংক্রান্ত কোনো ছবি বা ভিডিও ইন্টারনেটে যুক্ত ডিভাইসের সংস্পর্শে এলেই টের পায় ফেসবুক, গুগল, মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। এরপর এনসিএমইসির কাছে প্রতিবেদন যায়। কোনো একটি ঘটনা সম্পর্কে তারা যে বিস্তারিত তথ্য দেয়, তা দিয়ে অপরাধীকে শনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু অভিযান চালাতে গেলে নিপীড়নের শিকার শিশুর পরিবার ঘটনা বিশ্বাস করতে চায় না। তাদেরকে ছবি বা ভিডিও দেখানোর পর বিশ্বাস করলেও লোকলজ্জার কারণে মামলা করতে চান না। পরে বাধ্য হয়ে অভিযুক্তকে গ্রেফতারে পুলিশকেই মামলা করতে হয়।
আবার এনসিএমইসির কিছু ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, তা নিপীড়নের নয়। কারো মুঠোফোনে শিশুর খালি গায়ের ছবি শেয়ার করা হয়েছে। যেখানে নিপীড়নের কোনো বিষয় নেই। কিন্তু গুগল তার তথ্য সংগ্রহের পলিসি অনুযায়ী এটি এনসিএমইসিকে রিপোর্ট করেছে। এছাড়া প্রতিদিনই অসংখ্য তথ্য আসছে এনসিএমইসি থেকে। তবে পুলিশে জনবল খুবই সামান্য। এই ঘাটতি অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে বড় বাধা।
জানতে চাইলে মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, শিশুরা যে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, এটা তো আমাদের পত্রপত্রিকা থেকেই জানা যাচ্ছে। শিশু এবং নারী ধর্ষণের সংখ্যা প্রায় সমান সমান, কখনো বেশিও দেখা যাচ্ছে। শিশুরা তাদের নিজস্ব প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতা রাখে না, ফলে তারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিচিত মানুষের দ্বারাই শিশুরা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। লোকলজ্জায়ও পরিবারগুলো বিষয়টি চেপে যায়। পরিবার থেকে আইনি সহায়তা না নেওয়া বা প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে অপরাধীরা শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যায়।
এনসিএমইসির উদ্বেগজনক তথ্যের বিষয়ে পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে মালেকা বানু বলেন, পুলিশের অনেক বেশি সংবেদনশীল হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা তা দেখাচ্ছে না। পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কোথাও যে অভিযোগ জানানো যাবে, তেমন সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামোও আমাদের নেই। ফলে অপরাধীরা যখন নিশ্চিতভাবে জেনে যায় যে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ হবে না বা বিচার হবে না, তখন তারা ও অন্যরা আরও বড় ধরনের অপরাধে উৎসাহিত হয়। উত্তরণে পুলিশ প্রশাসনকে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
