আলোচিত-সমালোচিত যত মন্তব্য
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ওবায়দুল কাদের; ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আলোচিত-সমালোচিত সাধারণ সম্পাদক। ছিলেন সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতের দিল্লিতে আশ্রয় নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে-পরে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনার আত্মীয়স্বজনসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ-সদস্যদের বড় অংশ। ওবায়দুল কাদেরও ছিলেন সেই দলে। মসনদ হারানোর পর অবস্থা বুঝে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নেন কলকাতায়। সেখানকার সল্টলেকের বিলাসবহুল একটি ফ্ল্যাটে এখন আয়েশি জীবন কাটাচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একাধিকবার ছাত্রলীগের হয়ে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেন ওবায়দুল কাদের। কিন্তু একবারের জন্যও জয়ী হতে পারেননি। এরপর আশির দশকের প্রথমদিকে একটি দৈনিক পত্রিকায় জুনিয়র সাব-এডিটর হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। একসময় ‘নুন আন্তে পান্তা ফুরানো’ ওবায়দুল কাদেরের এর পরের উত্থানপর্ব ঠিক রূপকথার গল্পের মতো। বিশেষ করে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে ওঠেন তিনি। শেখ হাসিনার পর ওবায়দুল কাদেরই ছিলেন সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, টানা তিনবারের সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগের এই নেতা যতটা সাংগঠনিকভাবে নিজের দক্ষতা মেলে ধরেছেন, তার চেয়েও বেশি দক্ষ ছিলেন দুর্নীতির মাধ্যমে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনে। আর এর বাইরে পুরোটা সময় আলোচনায় থাকতেন, ভাইরাল হতেন বিতর্কিত, অপ্রাসঙ্গিক ও চটুল কথাবার্তার কারণে। বিরোধী দলের নেতাদের হেয় করে কথা বলা দাম্ভিক এই নেতা নিজের দলের নেতাকর্মীদের ‘কাউয়া’ (কাক) নামে অভিহিত করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেন। নেতাকর্মীরাও এর জবাবে তাকে ‘কাউয়া লীগ’-এর সাধারণ সম্পাদক বলে ডাকতেন। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে বিদ্রুপ করে বিভিন্ন সময় বলতেন, ‘দেখতে দেখতে ১৫ বছর, তারেক আসবে কোন বছর।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হচ্ছে তারেক রহমান এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী আর ওবাদুল কাদের ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়ে কলকাতায় ফেরারি জীবনযাপন করছেন। ওবায়দুল কাদের রজনৈতিক ময়দানে প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি যে স্লোগানটি ব্যবহার করতেন, তা হলো ‘খেলা হবে’, যা পরে ব্যাপক ভাইরাল হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচুর ট্রলের জন্ম দেয়। তিনি বলেন, খেলা হবে রাজনৈতিক অঙ্গনে, প্রস্তুত হয়ে যান। এ সময় নেতাকর্মীরাও ‘খেলা হবে’ স্লোগান দিতেন। ওবায়দুল কাদের বিভিন্ন সময় বলতেন, ‘তলে তলে অনেক কিছু হয়ে গেছে, তলে তলে অনেক কিছু হচ্ছে।’ পর্দার পেছনের সমঝোতা বোঝাতে তিনি প্রায়ই এই শব্দ ব্যবহার করতেন।
তার সবচেয়ে আলোচিত বক্তব্য হচ্ছে, ‘পালাব না’। দলীয় এক সমাবেশে তিনি বেশ দম্ভ করে বলেন, ‘পালাব না। কোথায় পালাব। আমরা পালাব না, প্রয়োজনে ফখরুল সাহেবের (বিএনপির সাবেক মহাসচিব এবং বর্তমানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) বাসায় গিয়ে উঠব। কি জায়গা দেবেন? নাহলে ঠাকুরগাঁওয়ে বাড়ি আছে না, ওই বাড়িতে গিয়ে উঠব। নিয়তির নির্মম পরিহাস, ওবায়দুল কাদেরই পালিয়ে গেছেন।
আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতির পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট ঠাকুরগাঁও সদরে বিএনপি আয়োজিত ঐক্য ও সম্প্রীতি সমাবেশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর জবাবে বলেন, ‘ওবায়দুল কাদের না পালিয়ে আমার ঠাকুরগাঁওয়ের বাড়িতে আসতে চেয়েছিলেন। এখন তিনি কোথায় পালিয়ে আছেন। এখন ঠাকুরগাঁওয়ে আছি, আমি আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’
মন্ত্রী হিসাবে একবার মিরপুরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয় পরিদর্শনকালে প্রতিষ্ঠানটির উপপরিচালক মাসুদুর রহমানকে উদ্দেশ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘মাসুদ তুমি ভালো হয়ে যাও।’ যা পরে ব্যাপক ভাইরাল হয়। তবে তার সব কথা ছাপিয়ে উঠে কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় দেওয়া নানা বক্তব্য। ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের উদ্দেশ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এরা হচ্ছে আত্মস্বীকৃত রাজাকার, যারা নিজেদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছে; তার জবাব দেওয়ার জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট।’ ওই সময় তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্রদের বিষয় ক্যাম্পাসের মধ্যেই সীমিত থাকবে। আমরা দেখি, রাজনৈতিকভাবে কারা প্রকাশ্যে আসে, তখন দেখা যাবে। আমরাও মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।’ তিনি ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দামকে বলেছিলেন, ‘তোমরা মারো না কেন; মারো।’ এভাবে সাধারণ ছাত্রদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে মাঠে নামাতে উসকানি দিয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের, যা শেষ অবধি আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ডেকে আনে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ক্ষমতার মসনদে থেকে ওবায়দুল কাদেরের আক্রমণাত্মক বক্তব্য ছাত্র আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে। তাদের মতে, ওবায়দুল কাদের রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ মানুষের কাছে চরম অহংকারী হিসাবে শুরু থেকেই সমালোচিত হয়ে আসছিলেন। নানা সময়ে তার বক্তব্য দেশে রাজনৈতিক সংকট ও সহিংসতাকে উসকে দিতে ভূমিকা রেখেছিল। বিশেষ করে আন্দোলন চলাকালীন সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে ওবায়দুল কাদেরের দেওয়া বিভিন্ন আক্রমণাত্মক ও উসকানিমূলক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। আন্দোলন দমাতে ছাত্রলীগকে জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে-তার এই বক্তব্য আন্দোলনকারীদের চরমভাবে ক্ষুব্ধ করেছিল।
