Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

জানুয়ারিতে ইউপি নির্বাচন শুরু

Advertisement

কাজী জেবেল

কাজী জেবেল

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জানুয়ারিতে ইউপি নির্বাচন শুরু

Advertisement

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন নভেম্বর থেকে শুরুর করতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন সরকারের সচিবরা। ওই সময়ে নির্বাচন আয়োজনে নানা প্রতিবন্ধকতা ইসির সামনে তুলে ধরেন তারা। যুক্তি তুলে ধরে সচিবরা বলেন, ‘নভেম্বর ও ডিসেম্বরে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা চলবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দিবস উপলক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ব্যস্ত থাকবেন। এছাড়া সরকারের অগ্রাধিকার কিছু কার্যক্রম চলমান রয়েছে, যেগুলো নির্বাচনের সময়ে বাস্তবায়ন করা যাবে না।’ এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে জানুয়ারিতে ইউপি নির্বাচন শুরুর পরামর্শ দিয়েছেন প্রায় সব সচিব।

নির্বাচন আয়োজনের আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও পরামর্শের প্রস্তাব দিয়েছেন কেউ কেউ। পাশাপাশি কম সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার কথাও বলেন তারা। কারণ হিসাবে সচিবরা বলেন, ‘দীর্ঘ সময় নিয়ে নির্বাচন করা হলে তখন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।’ বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ইসির সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের বৈঠক হয়। এতে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে বৈঠকে চারজন নির্বাচন কমিশনার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি, ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের আইজি মো. আলী হোসেন ফকির, জনপ্রশাসন সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।

বৈঠকের পর নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগামী বছর ৬ জুনের আগে ইউপি নির্বাচন শেষ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে পরীক্ষা থাকায় নির্বাচন আয়োজনে ‘স্পেস’ খুব কম পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে রমজানসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যাপারে, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ব্যাপারে আজকের সভায় আমি যদি এক লাইনে কনক্লুশন বলি, সবাই সম্মত হয়েছেন যে আমাদের নির্বাচনটা পারতপক্ষে ৬ জুনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে, অর্থাৎ এইচএসসি পরীক্ষার আগে।’

উল্লেখ্য, ইসি রোব ও সোমবার অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে সাত ধাপে ভোটগ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করে। ঘোষণা অনুযায়ী, সম্ভাব্য তারিখ হলো : প্রথম ধাপ ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ও শেষ ধাপের ভোট ২৭ মে। ইসির ওই তারিখ ঘোষণার পরই সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীরা তাদের প্রতিক্রিয়া জানান। তারা বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করে ইসি তারিখ নির্ধারণ করেছে।’

আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার পর নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত হবে বলেও তাদের কেউ কেউ মন্তব্য করেন। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে সচিবদের প্রায় সবাই নভেম্বর ও ডিসেম্বরে নির্বাচন আয়োজন না করার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে তারা জানুয়ারিতে ভোটের সময় নির্ধারণের কথা বলেন। ইসি সূত্র জানায়, শিগ্গিরই কমিশন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। ইসি চলতি বছরে এ নির্বাচন না করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বৈঠকে কয়েকজন সচিবের বক্তব্য দেওয়ার পর কথা বলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি। তিনিও অন্য সচিবদের বক্তব্য সমর্থন করে জানুয়ারিতে ভোটগ্রহন এবং ৬ জুনের আগে শেষ করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে বিভিন্ন কাজ বাস্তবায়নকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছে। এখন সরকারের সামনে আরও বেশকিছু কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য কার্ড দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।

ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন ধরনের কার্ড চালু করা হয়েছে। আরও কয়েকটি কার্ডের কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে একেবারে নিুস্তরের মানুষের কাছে সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে নির্বাচনের আগে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের একটি সুস্পষ্ট সময়সূচি থাকা প্রয়োজন। কারণ, নির্বাচনের সময় সরকার কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে কার্ড বা সুবিধা দিচ্ছে-এমন ধারণা তৈরি হলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এমনকি নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়েও কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন।’

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বসে এসব কর্মসূচির রোলআউট পরিকল্পনা ঠিক করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোন কর্মসূচি কখন বাস্তবায়ন করা হবে, নির্বাচনের আগে কোন কাজগুলো শেষ করতে হবে এবং কোনগুলো পরে করা যেতে পারে-এসব বিষয়ে পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘৬ জুন থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। তাই এর আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো শেষ করার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। এরপর জুলাইয়ে নির্বাচন আয়োজনের সুযোগও থাকবে না। ফলে নির্বাচনের সময়সূচি এবং সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্যে এখন থেকেই সমন্বয় করা জরুরি।’

বৈঠকের শুরুতেই বক্তব্য দেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ভোট না করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে জানুয়ারিতে নির্বাচনের পরামর্শ দেন। আইজিপি বলেন, ‘শেরপুর ও বগুড়া উপনির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ওই আদলে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনেও সমস্যা হবে না। পরিপূর্ণ প্রস্তুতি আমাদের আছে। ইনশাল্লাহ ভালো করতে পারব।’ বক্তব্যের এ পর্যায়ে তিনি নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ভোটের তারিখ নির্ধারিত কি না, তা জানতে চান। এরপরই তিনি বলেন, ‘ক্যালেন্ডারে নভেম্বর ও ডিসেম্বর যাচাই-বাছাই করে দেখেছি। আমাদের পক্ষ থেকে সাজেশন হলো-জানুয়ারি থেকে নির্বাচন শুরু করতে পারলে ভালো হয়।’

অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নভেম্বর ও ডিসেম্বর এড়ানো ভালো। ১ জানুয়ারি থেকে হোক, যেখান থেকেই নির্বাচন শুরু করেন আমাদের সমস্যা নেই।’

এরপর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব জেসমিন নাহার বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হবে ভোটকেন্দ্র। শিক্ষকরা ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকবেন। ডিসেম্বরে জাতীয় পর্যায়ের তিনটি ইস্যু আছে। ডিসেম্বরে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা হয়। নভেম্বর ও ডিসেম্বর শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নেওয়ার সময়। নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণে এসব বিষয় বিবেচনার জন্য অনুরোধ করছি।’

জনপ্রশাসন সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘নভেম্বর-ডিসেম্বরে পাবলিক পরীক্ষা, স্কুল-কলেজে ফাইনাল পরীক্ষা হয়। এই পরীক্ষাগুলোর কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যস্ত থাকে। যে কোনো পাবলিক পরীক্ষায় ম্যাজিস্ট্রেটরাও ব্যস্ত থাকেন। আমার পরামর্শ হলো-যদি জানুয়ারি থেকে রোজার আগ পর্যন্ত সময়ে নির্বাচনগুলো করে ফেলা যায়, তাহলে খুব কম সময়ে নির্বাচন শেষ হবে। কম সময় নিয়ে নির্বাচন করলে গণতান্ত্রিক সরকারের অনেক অগ্রাধিকার কাজ থাকে, সেগুলো বাস্তবায়ন ব্যাহত হয় না।’

স্থানীয় সরকার সচিব মো. শহীদুল হাসান বলেন, ‘আজ আমরা ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আরেকদিন বসলে ভালো হবে। সম্ভবত এ সভায় অর্থ সচিব আসেননি। নির্বাচনের জন্য বাজেট লাগবে। তেলসহ বিভিন্ন কারণে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। নির্বাচনের জন্য কী পরিমাণ বাজেট দিতে পারবেন, সেটা বোঝার বিষয় আছে।’ তিনি বলেন, ‘আজ আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নিই। তবে আইজিপি জানুয়ারিতে ভোটের তারিখ নির্ধারণে যা বলেছেন, তা বাস্তবসম্মত বলে মনে করি।’ শহীদুল হাসান বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে আমরা ইন্টারনালি (অভ্যন্তরীণ) আলোচনা করি, কীভাবে (ইসিকে) সহায়তা করা যাবে।পরবর্তী সময়ে আবারও বৈঠকে বসি।’

জনপ্রশাসন সচিবের বক্তব্যকে সমর্থন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘একটা নির্বাচিত সরকারের সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে গেলে ওই সরকারেরও রাজনৈতিক কিছু প্লেজেস (অঙ্গীকার) থাকে; যেটি তারা ভোটারদের দেখাতে চেষ্টা করে থাকে। সে ক্ষেত্রে যদি জানুয়ারিতে ভোটগ্রহণ করতে হয়, তাহলে ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করতে হবে। ওই সময়ে উন্নয়নকাজের ওপর এক ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ থাকে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ চলছে। জাতীয় ইভেন্টগুলোর নিরাপত্তা দিতে পুলিশবাহিনী ব্যস্ত থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।’

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম