লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে ডা. শফিকুর
৮ দফা না মানলে ১ দফায় পরিণত হবে
Advertisement
১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের পথসভায় বক্তৃতা করছেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। শনিবার বগুড়া মহানগরীর মাটিডালি বিমান মোড়ে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা ছয়টি দাবি নিয়ে লংমার্চ করেছি। দ্বিতীয় লংমার্চে আমরা আট দফা দিয়েছি। এসব দাবি ১৮ কোটি জনগণের। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গণভোটে ‘হ্যাঁ’তে ভোট দিতে বলেছিলেন; কিন্তু তিনি গণভোটের রায় মানেননি, অগ্রাহ্য করেছেন। তিনি বলেন, সরকার দাবি মানলে ভালো। না মানলে সব দফা এক দফায় পরিণত হবে। সেই এক দফার আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। শনিবার রাতে রংপুরের জিলা স্কুল মাঠে জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন; জুলাই গণহত্যার বিচার; বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ; দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন; সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ বহর রাত ৯টার দিকে সমাবেশস্থলে পৌঁছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তারা বলেন, সংবিধানে গণভোট নেই। তিনি বলেন, ফ্যাসিস্টদের সংবিধান অনুযায়ী আমরা তাড়াইনি। সংবিধানের বাইরে গিয়ে ফ্যাসিস্টদের তাড়ানো হয়েছে। যদি সংবিধানে গণভোট না থাকে তাহলে ২০২৬ সালে কোনো নির্বাচন নেই। কোনো সরকারও নেই। মানলে সবটা মানতে হবে। বাদ দিলে সবটা বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের পানিসম্পদমন্ত্রী বলেছিলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে, যে নামেই হোক। কিন্তু সাত মাস চলে গেল, নড়াচড়া দেখি না। কোন দিক থেকে কী পানিপড়া খেলেন? আপনাদের কণ্ঠে এখন আর জোর দেখি না। জনগণকে বারবার ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করবেন না। আমরা বলেছিলাম যদি নির্বাচিত করেন আল্লাহ তাহলে আমরা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব। আমরা বলেছিলাম, গোটা উত্তরবঙ্গকে আমরা কৃষির রাজধানী বানাব। নদীগুলোর জীবন ফিরিয়ে দেব।
জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করে আপনাদের পছন্দের দলগুলোকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্যায্য ফলাফল জাতির স্বার্থে মেনে নিয়েছিলাম। বিএনপি দফায় দফায় জাতির সাথে ওয়াদা দিয়ে তারা সব ওয়াদা ভঙ্গ করেছে। এখন তারা উল্টো রথে চলছেন। যে পথে হাসিনা চলেছে, স্পষ্টত দেখছি সেই পথেই হাঁটছে এই সরকার। যদি একই পথে হাঁটে, তাহলে পরিণতি একই হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা আট দফা দিয়েছি, এগুলো জনগণের দাবি। বিদ্যুৎ, গ্যাস সংকটে ভুগছে মানুষ। সার পায় না কৃষকরা, কাজ পায় না মানুষ। কিন্তু একটি দলের লোকেরা কাজ পায়। সেই কাজ হলো চাঁদাবাজি। চাঁদাবাজদের জ্বালায় জাতি অস্থির। চাঁদাবাজদের কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মানুষের জীবন দুর্বিষহ, অনেকের জীবনও যাচ্ছে। এমনকি পরে মানুষ যখন না পায়, নিজের মানুষকে পাথর মেরে হত্যা করে। তারা সন্ত্রাসী। সিরাজগঞ্জে শনিবার ১১ দলের এক কর্মীকে কুপিয়ে আহত করার বিষয় উল্লেখ করেন তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি-আর যদি এ ধরনের হামলা করা হয়, তাহলে ১৮ কোটি মানুষ নিয়ে সন্ত্রাসীদের কালো হাত ভেঙে দেয়া হবে।
শহীদ আবু সাঈদকে স্মরণ করে তিনি বলেন, সরকার জাতির সাথে প্রতারণা করলেও আমরা করব না, ঈমানদারির সাথে থাকব। এ সরকার নির্বাচনের আগে বলেছিল, তারা কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন করবে না। ইতোমধ্যে কুরআন-সুন্নাহবিরোধী সম্পত্তি হস্তান্তর আইন পাশ করেছে। যদি এ আইন করা হয় তাহলে বাংলাদেশের মুসলমানরা বসে থাকবে না। এ আইনের কারণে ঘরে ঘরে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। হারাম আইন প্রত্যাহার করে নিতে হবে।
তিনি বলেন, বিএনপি জাতির সাথে ওয়াদা ভঙ্গ করায় লংমার্চ করতে হচ্ছে। সমস্ত অন্যায় ও অপশক্তির বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলবে, আমরা বিশ্রাম নেব না। আমরা নেমেছি ১৮ কোটি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। সে অধিকার আদায় করে ঘরে ফিরব। জাতির প্রয়োজনে আট দফা এক দফায় পরিণত হতে পারে।
জামায়াত আমির বলেন, সংসদের ভেতর তীব্র প্রতিবাদ চলবে, রাজপথে আন্দোলন চলবে। আন্দোলনের মধ্যদিয়ে জনগণের দাবি আদায় করা হবে। যে আন্দোলনে মায়েরা নেমেছেন সে আন্দোলন সফল হবে। জীবন যাবে জুলাই দেব না। জুলাই বাস্তবায়ন হবে। দুর্নীতিমুক্ত ও আধিপত্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ হবে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার পাইনি। বিচার করতে হবে। যারা দেশে নাই তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হচ্ছে। দেশে যারা আছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা রায় দেখতে চাই।
নাহিদ বলেন, ১১ দলের আট দফা বাংলাদেশকে মুক্তি দিতে পারবে। আমরা দেশের নিরাপত্তা চাই, শিশুদের নিরাপত্তা চাই। সিরাজগঞ্জে ১১ দলের এক কর্মীকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। আর যদি একটি হামলা করা হয় তাহলে পালটা আঘাতের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। বিরোধী দল দমনের চেষ্টা ব্যর্থ হবে। বাংলাদেশ ঐক্যবদ্ধ।
এলডিপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, তিস্তা নদী শাসন করতে হবে। এটি হিন্দুস্তানের সমস্যা নয়। আমরা চাই না হিন্দুস্তানের ক্ষতি হোক, তাদেরও উচিত বলা যাতে আমাদের দেশের ক্ষতি না হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনার পাশের লোকদের কথা শুনবেন না, দেশের মানুষের কথা শুনতে হবে।
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রফেসর ওমর ফারুক, রংপুর-৩ আসনের সংসদ-সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ-সদস্য অধ্যাপক মো. গোলাম রব্বানী প্রমুখ।
এর আগে লাখো জনতার উপস্থিতিতে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখেন। সমাবেশ শেষে সকাল ৮টার দিকে লংমার্চের বহর রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করে। হাজার হাজার নারী-পুরুষ গোটা সড়কপথে ফুল ও স্লোগান দিয়ে অভিবাদন জানান।
পথে গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস, টাঙ্গাইলের নগর জলফৈ বাইপাস রোড, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মোড়, বগুড়ার মাটিডালি বিমান মোড় ও গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সবশেষ রংপুরের জিলা স্কুল মাঠে লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও লংমার্চ রুটের বিভিন্ন স্থানে গণজমায়েত স্থলে ১১ দলের নেতাকর্মীদের দেওয়া অভিবাদন গ্রহণ করে লংমার্চের বহর।

