চুল কেটে নির্মম নির্যাতন, ‘ছাদ থেকে পড়ে’ মৃত্যু
প্রাণ দিয়ে ‘ভাতের দাম’ দিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র
আমার ছেলেকে ওরা পিটিয়ে মেরেছে, আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম-বাবা
Advertisement
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এক প্লেট ভাতের দাম আর কত হতে পারে? খুলনায় সেই দাম চুকাতে হলো এক তরুণকে নিজের জীবন দিয়ে। মেসে ‘মিল’ না দিয়ে ভাত খাওয়া কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আজমল হোসেনকে পাঁচতলার ছাদে নিয়ে মারধর ও চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মেসের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে। নির্যাতনের একপর্যায়ে ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যু হয় তার। মৃত্যুর আগে বাবাকে ফোনে বলেছিলেন, ‘বাবা, আমি ভাত খেয়েছি বলে ওরা আমাকে মারধর করছে।’ সন্তানের এমন মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা-বাবা।
নিহত মো. আজমল হোসেন (২২) খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা উপজেলার বড় শোলুয়া গ্রামে। পুলিশ বলছে, ছাদ থেকে তিনি নিজে লাফ দিয়েছিলেন নাকি তাকে ফেলে দেওয়া হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে; উদ্ধারের চেষ্টা চলছে সিসিটিভি ফুটেজও। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) হলরোড সংলগ্ন ইসলামনগর এলাকায় আকিবের বাড়িতে ভাড়া দেওয়া একটি মেসে থাকতেন আজমল। ওই মেসের নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো বেলায় খাবার খাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা আগে তা দায়িত্বপ্রাপ্তদের জানাতে হয়। কিন্তু শুক্রবার রাতে খাবারের বিষয়টি নিশ্চিত না করেই আরেকজনের ভাত খেয়ে ফেলেন আজমল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তার ওপর চড়াও হন মেসের অন্য সদস্যরা। কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে আজমলকে পাঁচতলা ভবনের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে আটকে রেখে বেদম মারধর করা হয় এবং মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে ছাদ থেকে নিচে পড়ে যান আজমল। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, রাতে হঠাৎ শব্দ শুনে বাইরে গিয়ে দেখি ছেলেটা পড়ে আছে। ভ্যানে তোলার সময় দেখলাম তার সারা শরীরে আঘাতের কালচে দাগ। ছেলের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন আজমলের মা। তিনি বলেন, আমার ছেলের শরীরে কোনো জায়গায় বাদ নেই, পিটিয়ে সব কালো করে ফেলেছে।
নিহত আজমলের বাবা কুতুবউদ্দিন জানান, শুক্রবার রাতে মেস থেকে আজমল তাকে ফোন করেছিলেন। তাকে বাঁচাতে আকুতি জানিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, আমার ছেলে ফোন দিয়ে বলে, আব্বু, আমি ভাত খেয়েছি বলে ওরা আমাকে মারধর করছে। ওরা বলছে, আমি নাকি ভাত আর টাকা চুরি করেছি। এরপর এক ছেলের সঙ্গে কথা বললে সে বলে, আপনার ছেলে ২৩শ টাকা চুরি করেছে; এক লাখ টাকা নিয়ে এখানে চলে আসেন।
টাকার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়ে ওই রাতে ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন বাবা। কিন্তু এরপর থেকেই ছেলের মোবাইল ফোন বন্ধ পান তিনি। কুতুবউদ্দিন বলেন, আমার ছেলেকে ওরা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত ১টা ৩০ মিনিটের দিকে কয়েকজন যুবক গুরুতর আহত অবস্থায় আজমলকে খুমেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এসময় তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানান, আজমল একটি ভবনের পাঁচতলা ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছেন।
ঘটনাস্থলে থাকা খুবির সাবেক এক শিক্ষার্থী বলেন, ওই ছাত্রকে (আজমল) খাবারসহ বিভিন্ন জিনিস চুরির অভিযোগে মারধর করা হয়। তিনি বলেন, প্রথমে মোবাইল ফোনে লাউডস্পিকারে ওই ছাত্রকে তার বাবার সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়। তখন তিনি তার বাবাকে জানান যে, তিনি টাকা ও অন্যান্য জিনিস চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। তার বাবা তাকে জিজ্ঞেস করেন, কেন তিনি এসবের মধ্যে গেছেন। এরপর ফোনটি রিফাত নামে একজনের কাছে দেওয়া হয়। তিনি ওই ছাত্রের বাবাকে বলেন, আপনার ছেলে এই কাজ করছে, আপনার তো আসা উচিত। আপনি কালকে আসেন, এসে একটা ব্যবস্থা করেন। এখানে তো আর রাখা যাবে না।
মেসের একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চুরির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য আজমলকে ভবনের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। শুরুতে সেখানে ১০-১২ জনের মতো শিক্ষার্থী ছিলেন। পরে আরও অনেক লোকজন জড়ো হন। ওই সময় তাকে মারধর করা হয় এবং তার চুল কেটে দেওয়া হয়। তারা আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদের সময় ছাদে যেখানে বৃষ্টির পানি জমে পিচ্ছিল ছিল, সেখান থেকে আজমল লাফ দিয়েছিলেন। তখন তাকে ধরার কোনো সুযোগ ছিল না।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের হরিণটানা থানা এ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, পাঁচতলার ছাদ থকে আজমলের পড়ে যাওয়ার বিষয়টি তারা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। বাঁচার জন্য আজমল নিজে লাফ দিয়েছিলেন, নাকি তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধারের চেষ্টাও চলছে।
শনিবার ময়নাতদন্ত শেষে আজমলের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর আগে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে হরিণটানা থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দিন বলেন, ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের ঘটনায় আমাদের কোনো এখতিয়ার নেই। তবে আমরা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি এবং এ বিষয়ে তাদের সহায়তা করছি।
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করা হয়েছে। আমরা ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছি।
