জাতিসংঘের মঞ্চে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একই পরিবারের তিন সদস্য। তিনটি ভিন্ন সময়। কিন্তু মঞ্চ এক-জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। ৪৬ বছর আগে ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে যে মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর সেই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন তার স্ত্রী ও বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এবার সেই মঞ্চে দাঁড়াতে যাচ্ছেন তাদের ছেলে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসাবে জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে বক্তব্য দেবেন তিনি। আর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এটি হবে তার প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত একটি পারিবারিক অধ্যায়ের নতুন পৃষ্ঠা খুলবে ওইদিন নিউইয়র্কে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোর রাতে তিনি নিউইয়র্কে পৌঁছান। এর আগে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানটি সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা ৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে আসে। প্রধানমন্ত্রী, তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীদের বহনকারী তুর্কি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতি নেয়। দুই ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের যাত্রাবিরতি শেষে ফ্লাইটটি তুরস্ক সময় দুপুর ২টা ১০ মিনিটে নিউইয়র্কের উদ্দেশে ছেড়ে আসে।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানানোর সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তারসহ ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা।
তবে এবারের ঘটনাটি শুধু পারিবারিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতা নয়। বাংলাদেশের জন্য ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনটি আরও একটি কারণে ব্যতিক্রমী। একই অধিবেশনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ফলে বিশ্বসংস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের প্রথম অংশগ্রহণ এবং সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে একজন বাংলাদেশি-দুটি বিষয় একই সময়ে ঘটছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্বে ড. খলিলুর রহমানের মূল প্রতিপাদ্য-‘আস্থা ফিরিয়ে আনা, পরিবর্তনকে সামলে নেওয়া-সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ।’
বাবার ভাষণে ছিল ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও বৈষম্যের কথা : ১৯৮০ সালের সেই সময়টি ছিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও উন্নত-অনুন্নত বিশ্বের গভীর বৈষম্যের সময়। জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে জিয়াউর রহমান তার ভাষণে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর ব্যবধান, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতির ঘাটতি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংকটের বিষয়টি সামনে আনেন। তার বক্তব্যে শান্তি, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক দায়িত্বের বিষয়ও গুরুত্ব পায়। চার দশকের বেশি সময় পর সেই একই বিশ্বমঞ্চে তার ছেলে যখন দাঁড়াবেন, তখন বাংলাদেশের বাস্তবতা বদলেছে, বিশ্বও বদলেছে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুচ্যুতি, প্রযুক্তির অসম ব্যবহার, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে।
মায়ের ভাষণে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও পানির অধিকার : ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের ৪৮তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে খালেদা জিয়ার প্রথম ভাষণের কেন্দ্রেও ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার ও উন্নয়নের প্রশ্ন। তিনি বলেছিলেন, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পরস্পরকে শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে ছোট রাষ্ট্রগুলোর অধিকার সুরক্ষা, ন্যায়সংগত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়টিও তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেন। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে খালেদা জিয়ার পাঁচবার বক্তব্য দেওয়ার রেকর্ড রয়েছে।
এবার আলোচনার কেন্দ্রে নতুন বাংলাদেশের বার্তা : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রোববারের ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো থাকবে। এর সঙ্গে থাকবে যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের প্রসঙ্গ। অর্থাৎ চার দশক আগে যে মঞ্চে বাংলাদেশের হয়ে কথা উঠেছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য ও উন্নয়নের প্রশ্ন, এবার সেই মঞ্চেই বাংলাদেশের আলোচনার পরিধি আরও বিস্তৃত-গণতান্ত্রিক রূপান্তর থেকে জলবায়ু ন্যায়বিচার, রোহিঙ্গা সংকট থেকে প্রযুক্তির ন্যায়সংগত ব্যবহার, আর জাতিসংঘের সংস্কার থেকে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা।
জলবায়ু বাংলাদেশের অন্যতম বড় দাবি : তারেক রহমানের এবারের সফরে জলবায়ু ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এরই মধ্যে জানিয়েছেন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি, জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য বিষয়টি কেবল পরিবেশের প্রশ্ন নয়। এটি খাদ্য, পানি, কৃষি, উপকূলীয় জনপদ, বাস্তুচ্যুতি এবং মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। ফলে জাতিসংঘের ভাষণে জলবায়ু প্রশ্নটি বাংলাদেশের বৈশ্বিক কূটনীতির একটি বড় জায়গা দখল করতে যাচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকটেও চাইবে বিশ্বসমর্থন : মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনও প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি সাইড ইভেন্টে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার কথা রয়েছে। সেখানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে জাতিসংঘ মহাসচিব, জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠকের কথাও রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শান্তি ইনস্টিটিউট এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী মহলের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
একই মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী ও সাধারণ পরিষদের সভাপতি : এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের উপস্থিতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো-সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘে দীর্ঘ কূটনৈতিক ও পেশাগত অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসেবা ও জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাজ করেছেন। ৮১তম অধিবেশনের শুরুতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি সংলাপ, ঐকমত্য ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে তার সভাপতিত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসাবে তুলে ধরেছেন। ফলে ২৪ সেপ্টেম্বর যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের বক্তৃতামঞ্চে উঠবেন, তখন সভায় সভাপতির আসনেও থাকবেন একজন বাংলাদেশি। কূটনৈতিকভাবে এটি বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বিশাল সাফল্য।
ইতিহাসের সামনে নতুন অধ্যায় : ১৯৮০ সালে বাবা বলেছিলেন বিশ্বের বৈষম্য ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংকটের কথা। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুচ্যুতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রযুক্তির দ্রুত রূপান্তর এবং জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন-সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে, যেখানে কোনো একটি দেশের সংকট আর কেবল সেই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এই বাস্তবতায় ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে তারেক রহমান কী বলেন, কোন বিষয়কে বাংলাদেশের প্রধান দাবি হিসাবে তুলে ধরেন এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে কী ধরনের সহযোগিতা চান-সেদিকেই এখন নজর থাকবে। কারণ সেদিন শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা দেবেন না; একটি পরিবারের চার দশকের বেশি সময়ের জাতিসংঘ-যাত্রার তৃতীয় অধ্যায়ও লেখা হবে। আর সেই অধ্যায়ের সামনে থাকবে একটি বড় প্রশ্ন-জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সময়ের বাংলাদেশ থেকে ২০২৬ সালের বাংলাদেশ বিশ্বসভায় নিজের জন্য ঠিক কী নতুন জায়গা দাবি করতে যাচ্ছে।

