Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

লোকসানের দায়মুক্তি চায় বিপিসি

Advertisement

এম শাহজাহান

এম শাহজাহান

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

লোকসানের দায়মুক্তি চায় বিপিসি

ফাইল ছবি

Advertisement

সরকার নির্ধারিত দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করতে গিয়ে ২৭ হাজার ৪২০ কোটি টাকা লোকসানের দায় থেকে মুক্তি চেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিপিসির নথিতে ঋণ হিসাবে থাকা এই বিপুল অর্থ ভর্তুকিতে রূপান্তর বা ডিএসএল (ডেট সার্ভিস লায়াবিলিটি) বই থেকে অবলোপনের প্রস্তাব দিয়েছে। বিপিসি বলছে, এ ঋণ মূলত বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের কারণে নয়। সরকার নির্ধারিত মূল্যে তেল বিক্রির কারণে আমদানি মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যজনিত ঘাটতি মেটাতে বিভিন্ন সময়ে সরকারই এই অর্থ ঋণ হিসাবে বিপিসিকে দিয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের। ২০১৬ সাল থেকে এ ঋণকে ভর্তুকিতে রূপান্তরের জন্য দফায় দফায় সরকারি পর্যায়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়েছে। এমনকি অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের ২০২২ সালের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়েছিল-আমদানি মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রির কারণে দেওয়া এই ঋণকে ভর্তুকি হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এরপরও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

এদিকে পুরোনো দায়ের সঙ্গে চলতি বছরও জ্বালানি তেলের বাজারে বিপুল লোকসানের মুখে পড়েছে বিপিসি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে দাম, জাহাজভাড়া ও বিমা ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পর মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, এই চাপ সামাল দিতে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ডিজেল ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সবকিছু বেড়ে যাওয়ায় মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প ছিল না।

পুরোনো দায় ২৭ হাজার কোটি টাকা : বিপিসির নথি অনুযায়ী, ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত জ্বালানি তেলের আমদানি মূল্য ও সরকার নির্ধারিত স্থানীয় বিক্রয়মূল্যের পার্থক্য থেকে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। জাতীয় স্বার্থে সরকার দীর্ঘ সময় তেলের দাম আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় না করায় এ ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। পরে ২০১৬ সালে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের মাধ্যমে অর্থ বিভাগকে অনুরোধ করা হয়-লোকসান সমন্বয়ের জন্য বিপিসিকে দেওয়া ২৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা ঋণকে ভর্তুকিতে রূপান্তর করা হোক। পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এনবিআরের পাওনা ভ্যাট পরিশোধের বিষয়টি নিষ্পত্তির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বিপিসির নথিতে বলা হয়েছে, এনবিআরের পাওনা বাবদ মোট ২ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা পাঁচ কিস্তিতে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে এ বিষয়ে এনবিআরের কোনো বকেয়া নেই। ২০২১ সালে আবারও ২৭ হাজার ৪২০ কোটি টাকা ভর্তুকিতে রূপান্তরের অনুরোধ করা হয়। শেষ পর্যন্ত কাজ হয়নি। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বিপিসির উত্থাপিত তথ্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়।

দায়মুক্তির তিন পথ : বিপিসি এখন মূলত তিনটি পথের কথা বলছে। প্রথমত, পুরো ২৭ হাজার ৪২০ কোটি টাকা ভর্তুকিতে রূপান্তর করা। দ্বিতীয়ত, ইতোমধ্যে সরকারি কোষাগারে বিপিসির জমা দেওয়া উদ্বৃত্ত তহবিল ও লভ্যাংশের সঙ্গে এই দায় সমন্বয় করা। তৃতীয়ত, অবশিষ্ট দায় জ্বালানি তেলের মূল্য কাঠামোর মাধ্যমে ধীরে ধীরে সমন্বয় করা। বিপিসির হিসাবে, তাদের উদ্বৃত্ত তহবিলের পরিমাণ ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং ৫ হাজার ১৫০ কোটি টাকা লভ্যাংশ। দুইয়ে মিলে তাদের ১৬ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা রয়েছে। এই অর্থ সমন্বয় করা হলে বাকি থাকে ১০ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। বিপিসির প্রস্তাব হচ্ছে, এই অবশিষ্ট অর্থ জ্বালানি তেলের মূল্য কাঠামোয় লিটারপ্রতি ১ টাকা করে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সমন্বয় করা যেতে পারে। আরেকটি প্রস্তাবে পুরো ২৭ হাজার ৪২০ কোটি টাকা লিটারপ্রতি ২ টাকা করে মূল্য কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।

নতুন করে ২২ হাজার কোটি টাকার চাপ : পুরোনো ঋণ অবলোপনের আলোচনা যখন আবার সামনে এসেছে, তখনই বিপিসি নতুন করে বড় লোকসানের মুখে পড়েছে। বিপিসির হিসাবে গত মার্চ থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত লোকসান হয় ২০ হাজার ৬০ কোটি টাকা। আগস্টের হিসাব ধরে এই লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এছাড়া বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলামও বলেছেন, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত সংস্থাটির প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বা লোকসান হয়েছে। বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রির কারণেই এ চাপ তৈরি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও সরকার চাইলে কর ও বিপিসির মুনাফার মতো নীতিগত উপাদান ব্যবহার করে দেশীয় বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা সামাল দিতে পারে। জ্বালানি আমদানিতে বিভিন্ন ধরনের কর রয়েছে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় সেগুলো সমন্বয়ের সুযোগ সরকারের রয়েছে।

অর্থ বিভাগের সিদ্ধান্তই এখন মূল : বিপিসির প্রস্তাব পাশ হলে ২৭ হাজার ৪২০ কোটি টাকার দায় আর সংস্থাটির নিয়মিত ঋণ হিসাবে বহন করতে হবে না। অর্থ বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেছেন, বিপিসির প্রস্তাব কার্যকর হলে সংস্থাটির দায় কমবে, ব্যালান্সশিট শক্তিশালী হবে এবং ভবিষ্যতে জ্বালানি আমদানির জন্য অর্থায়ন ও নগদপ্রবাহ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি তৈরি হতে পারে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম