অগ্নিমূল্যে দিশেহারা সাধারণ মানুষ
চাল সবজিসহ নিত্যপণ্যের বাজারে উত্তাপ
Advertisement
ইয়াসিন রহমান
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা লেগেছে নিত্যপণ্যের বাজারে। সাধারণ মানুষের আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়ে গেছে ২০-৩০ ভাগ বেশি। গত দুদিনে বাজারে ঢোকাই কঠিন হয়ে পড়েছে অনেকের। সীমিত আয় বা নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে মধ্যবিত্ত-কেউই নেই স্বস্তিতে। সংসারে বাড়ছে খরচের চাপ। এরই মধ্যে নিত্যপণ্যের বাজারে চাল, সবজি, আটা-ময়দা, ভোজ্যতেলসহ বেড়েছে অন্তত ১২টি পণ্যের দাম। সামনে আরও বাড়তে পারে সব ধরনের পণ্য ও সেবার মূল্য-এমন আশঙ্কায় দিশেহারা সব মানুষ। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন- একদিকে জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম, অন্যদিকে পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, সব মিলে সাধারণ মানুষের জীবনে বাড়ছে বাড়তি চাপ, উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ও বাজার সিন্ডিকেটের কারণে বাজার ছিল অস্থির। ভোক্তা ছিল অসহায়। পটপরিবর্তনের পর দেশের মানুষের আশা ছিল দুর্নীতি কমবে। বাজার নিয়ে অন্তত তাদের দুশ্চিন্তা করতে হবে না। কিন্তু মানুষের মাঝে সেই স্বস্তি ফেরেনি। অন্তর্বর্তী সরকারও বাজার ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। বরং নানা অব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতায় অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে। এমন ভঙ্গুর বাস্তবতায় বিএনপি সরকারে আসায় মানুষের প্রত্যাশা ছিল-নতুন রাজনৈতিক সরকার জনগণের কষ্ট বুঝবে। বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে। কমবে নিত্যপণ্যের দাম। অবশ্য সরকারও বাজার নিয়ন্ত্রণে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়। কিন্তু শুরুতেই মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব পড়ে জ্বালানি খাতে। এরপর গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং দুদিন আগে সর্বশেষ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহণসহ বিভিন্ন সেবা ও পণ্যের বাজার চরম অস্থির হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় দেশের অন্তত ৮০-৯০ ভাগ মানুষ তাদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্ট্যাডিজের (বিআইডিএস)’ সাবেক মহাপরিচালক ড. এম কে মুজেরী যুগান্তরকে বলেন, এমনিতে পণ্যের মূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিধ্বস্ত। আয় নেই। বেকারত্ব বাড়ছে। এ অবস্থায় নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা লেগেছে। অর্থনীতির সব খাতে এর প্রভাব পড়বে। ফলে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে এবং ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মঙ্গলবার রাজধানীর একাধিক খুচরা বাজার ঘুরে জানা গেছে, প্রতিকেজি মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ টাকা, যা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির আগের দিন অর্থাৎ শনিবার ছিল ৫৫ টাকা। প্রতিকেজি বেগুন আকার ও মানভেদে ৯০-১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা ছিল আগে ৮০-১২০ টাকা। প্রতিকেজি শসা সর্বনিম্ন ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এই একই শসা শনিবার সর্বনিম্ন ৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতিকেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে সর্বনিম্ন ১২০ থেকে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা, যা দুই দিন আগে ছিল সর্বনিম্ন ৮০ টাকা। প্রতি ডজন (১২ পিস) ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৬৫ টাকায়, যা আগে ১৫০ টাকা ছিল। আমদানি করা রসুন বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ১৮০ টাকা, যা আগে ১৬০ টাকা ছিল।
খুচরা পর্যায়ে বড় দানার মসুর ডাল প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৯৫-১০০ টাকা, যা আগে ৯০-১০০ টাকা ছিল। প্রতিকেজি খোলা আটা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ৪৮ টাকা ছিল। পাশাপাশি প্রতিকেজি খোলা ময়দা প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা, যা আগে ৬৫ টাকা ছিল। খোলা পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ১৭০ টাকা, যা আগের দিনও ১৬৬ টাকা ছিল। প্যাকেটজাত তরল দুধ প্রতিলিটার বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা, যা আগে ১০০ টাকা ছিল।
বাজারের মুদি ব্যবসায়ী মশিউর রহমান বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহণ ভাড়া বেড়েছে। তাই যেসব পণ্য নতুন করে আনতে হয়েছে, সেগুলোর দাম বেড়েছে। আর যেসব পণ্য আগে আনা আছে, সেগুলোর দাম এখনো বাড়েনি। ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির যুগান্তরকে বলেন, তেল সংকট ও ওই সময় মূল্য বৃদ্ধিতে তখন এক দফা ৪-৫ হাজার টাকা ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। তিন দিন আগেও বগুড়া থেকে একটি ট্রাক ঢাকায় আসতে ভাড়া ছিল ১৮-২০ হাজার টাকা। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে ২-৩ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া নিতে হচ্ছে।
মানুষের উদ্বেগ, মনে হচ্ছে না খেয়ে মরতে হবে : মঙ্গলবার দুপুর ১টা ১৭ মিনিট। প্যাডেলচালিত তিন চাকার ভ্যান শিকল দিয়ে তালা লাগিয়ে রাজধানীর কাওরান বাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসেন কামরুল হাসান। তিনি প্রায় ৩০ মিনিট বাজার ঘুরলেন। কিন্তু কিছুই কিনলেন না। তিনি যুগান্তরকে জানান, গতকাল ভোররাত থেকে পণ্য পরিবহণ শেষে ৬৬৫ টাকা ইনকাম করেছি। সপ্তাহে ২ থেকে ৩ দিন ভ্যান নিয়ে বের হতে পারি। এই টাকার মধ্যে ভ্যান মালিকের জমা দিতে হবে। পাশাপাশি পরিবারের ৫ সদস্যের জন্য খাবার কিনতে হবে। কিন্তু এমনিতেই বাজারে পণ্যের যে দাম তা শুনেই মাথা ঘুরছে। শুক্রবার বাজার করতে এসেছিলাম। এখন এসে দেখি অনেকগুলো পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বিক্রেতারা বলছেন, সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে, তাই পণ্যের দাম বেড়েছে। মনে হচ্ছে একটা সময় আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।
বেতন দিয়ে মাস চালাতে পারছি না, আমি ঋণগ্রস্ত : রাজধানীর কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকার বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। মাসে পান ৩৩ হাজার টাকা বেতন। মা, স্ত্রী ও এক মেয়ে নিয়ে তার সংসার। পরিবারের খাবার জোগাড় করতে মাসে ৫০ কেজির এক বস্তা চাল ৩ হাজার; পাঁচ লিটার তেল ১ হাজার; বাসাভাড়া ১০ হাজার; বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল ২ হাজার; সবজি, মাছ, ব্রয়লার মুরগিসহ তরকারি ও রান্নার উপকরণ কিনতে ৭ হাজার; সাবান-ডিটারজেন্ট ও শ্যাম্পু ৭০০; মুদিবাজার আরও ২ হাজার এবং মোবাইল টকটাইমে খরচ ও ইন্টারনেট বিল ১২০০ টাকা ব্যয় হয়। পাশাপাশি সন্তানের শিক্ষাব্যয় ৭ হাজার, পরিবারের যাতায়াত ব্যয় ৫ হাজার এবং মাসে গড়ে চিকিৎসা ব্যয় ২ হাজার টাকা ধরে ৩৪ হাজার ৬০০ টাকা ব্যয় হয় তার। প্রতিমাসে তার ঘাটতি থাকে কম হলেও ১ হাজার ৬০০ টাকা। তিনি বলেন, বেতন দিয়ে মাস চালাতে পরছি না। আমি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছি।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণাই মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কারণ তেলের দাম শুধু পরিবহণ ব্যয়ই বাড়ায় না, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে। শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির ব্যয়-সবখানেই বাড়বে খরচ। সেই বাড়তি ব্যয়ের শেষ বোঝাটিও বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকেই। তিনি বলেন, এরই মধ্যে অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে। তাই জ্বালানি তেলের মূল্যবদ্ধির প্রভাবে পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ার কথা তা যেন অসাধুরা কারসাজি করে বেশি না বাড়াতে পারে সেদিকে তদারকি সংস্থার নজরদারি করতে হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে তেমন প্রভাব পড়বে না। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব যাতে অন্য পণ্যের দামে না পড়ে, সেজন্য সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সম্ভাব্য যে অভিঘাত তৈরি হতে পারে, তা কীভাবে কমানো যায়, সেজন্য আমরা কাজ করছি। মূল্য স্থিতিশীল থাকবে এবং মূল্যের ওপর তেমন লক্ষণীয় কোনো অভিঘাত আসবে না বলে আমরা আশা করছি।
