Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

নথি বদলে যুক্তরাষ্ট্র সফরে কর্মকর্তা

বেবিচকে নজিরবিহীন জিও জালিয়াতি

Advertisement

সাইফ আহমাদ

সাইফ আহমাদ

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বেবিচকে নজিরবিহীন জিও জালিয়াতি

Advertisement

চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরে অনুমোদিত তিন কর্মকর্তার নামের তালিকা। মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সেই সরকারি প্রস্তাবের বাইরে গিয়ে চূড়ান্ত আদেশে (জিও) ঢুকেছে নতুন নাম। অনুমোদিত প্রতিনিধিকে বাদ দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে এমন এক নির্বাহী পরিচালককে, যার নাম প্রাথমিক নথিতেই ছিল না। কার প্রস্তাবে এবং কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে এই রদবদল ঘটানো হলো-নথিপত্রে এর ব্যাখ্যা নেই।

কম্পিউটারভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা (সিবিটি) ল্যাব আধুনিকীকরণ প্রকল্পের পণ্য পরীক্ষায় (এফএটি) বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে ঘটেছে এমন নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা। এ ঘটনায় বেবিচকের ভেতরেই শুরু হয়েছে তোলপাড়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি শুধু এক কর্মকর্তার বিদেশ সফরের সুযোগ পাওয়া না-পাওয়ার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে কর্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও সরকারি নথির অখণ্ডতার প্রশ্ন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক হলেন ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, মূল প্রস্তাব ও চূড়ান্ত জিওর মধ্যে অমিল থাকলে দেখতে হবে পরিবর্তনের পেছনে কার নোট রয়েছে। তিনি বলেন, দাপ্তরিক তথ্যের ধারাবাহিকতা না থাকলে এটি প্রশাসনিকভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি নথির এমন খেয়ালখুশি পরিবর্তন প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের এক চরম দৃষ্টান্ত।

মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে জানতে চাইলে জিওতে সাক্ষরিত বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. নুরুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, আমরা যেভাবে নাম পেয়েছি, সেভাবেই জিও করা হয়েছে। তালিকায় রদবদল ও নথি টেম্পারিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে দায় এড়িয়ে তিনি বলেন, এর বেশি কিছু বলতে পারব না।

তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদারসংক্রান্ত সফরের জন্য গত ৩০ জুলাই বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক স্বাক্ষরিত স্মারকপত্রে তিন কর্মকর্তার নাম সুপারিশ করা হয়।

এর প্রধান হিসাবে ১ নম্বরে ছিলেন বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) অতিরিক্ত সচিব এসএম লাবলুর রহমান। তালিকার অন্য দুজন ছিলেন পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ কায়সার এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উপপরিচালক স্কোয়াড্রন লিডার এসএম তানজিল আহসান।

তবে ২০ সেপ্টেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. নুরুল হুদা স্বাক্ষরিত চূড়ান্ত জিওতে চেয়ারম্যানের সুপারিশকৃত তালিকার লাবলুর রহমানের স্থানে তালিকায় যুক্ত হন বেবিচকের সিভিল অ্যান্ড ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সার্ভিসেস ইউনিটের (সেমসু) নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুল ওয়াদুদ।

একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরিত চিঠি পাঠানোর পর তালিকায় পরিবর্তন আনতে হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়াই নিয়ম। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি সেভাবে সম্পন্ন হয়নি।

বেবিচকের একজন সদস্য যুগান্তরকে জানান, চেয়ারম্যানের সই করা ফাইল ও চিঠি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর ফেরত এসেছিল। পরবর্তীতে দেখা যায়, প্রাথমিক তালিকার একজন কর্মকর্তার নাম বাদ দিয়ে একেবারে নতুন একজনের নামে জিও জারি করা হয়েছে। বর্তমানে বিমান পরিবহণমন্ত্রী বিদেশে আছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রী দেশে ফেরার পর পুরো বিষয়টি তার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হবে। এদিকে যুগান্তরের হাতে আসা নথি পর্যালোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি দেখা গেছে। বেবিচকের প্রস্তাবিত সফরের নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর এ সংক্রান্ত জিও জারি করেছে মন্ত্রণালয়।

নথি অনুযায়ী, বেবিচকের প্রস্তাবিত সূচি অনুযায়ী প্রতিনিধি দলের যুক্তরাষ্ট্র সফরের নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৬ সালের ৮ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর। অথচ মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত জিও জারি করা হয় ২০ সেপ্টেম্বর। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যে কোনো বিদেশ সফরের আগেই অনুমোদন ও জিও জারির বাধ্যবাধকতা থাকলেও, নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর কেন তা জারি করা হলো-তা নিয়ে প্রশাসনিক ও আইনি প্রশ্ন উঠেছে।

বেবিচকের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সফর অনুমোদন ও প্রতিনিধি দল গঠনের পুরো প্রক্রিয়াটিতে স্বচ্ছতার অভাব ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাক্টরি একসেপ্টেন্স টেস্টের (এফএটি) মতো সংবেদনশীল ও কারিগরি পরীক্ষায় প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রকল্পের ধরন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্বের সামঞ্জস্য রক্ষা করা জরুরি।

বর্তমান প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নিরাপত্তা নিরীক্ষা, বিমানবন্দর নিরাপত্তা এবং বিস্ফোরক শনাক্তকরণ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে প্রতিনিধি দল গঠনে অস্পষ্টতা পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেবিচকের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সংস্থা থেকে প্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয়টি চেয়ারম্যানের এখতিয়ার। একই পর্যায় থেকে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তে চেয়ারম্যান ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সেমসুর নির্বাহী পরিচালক আবদুল ওয়াদুদ যুগান্তরকে বলেন, কীভাবে আমার নাম এসেছে তা জানি না। চেয়ারম্যান সুপারিশ করলেই যে সেই নামই চূড়ান্ত হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। মন্ত্রণালয় চাইলে অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য কাউকেও মনোনয়ন দিতে পারে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম