মিরপুরে মুখোশধারীদের তাণ্ডবে আতঙ্ক
মধ্যরাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র
হামলা ও লুটপাটের পর টানানো হলো ‘সমমনা দোকানদার সমিতি’র সাইনবোর্ড * ওষুধ ও মালামাল লুটসহ প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ * মূল মালিকরা দখলদারদের উচ্ছেদ করে জমি বুঝে নিয়েছে-হামলাকারীদের দাবি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন ও মিরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মিরপুর ১ নম্বরে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা বেসরকারি সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেয়। এ সময় তারা লুটপাটও চালায়। ছবিটি শুক্রবার তোলা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর মিরপুরে ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে’ মুখোশ পরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের ওই হামলায় ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। হামলাকারীরা জমিটির সামনে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’- নামে একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছে। এ ঘটনায় মিরপুর শাহআলী থানায় মামলা করেছে রাড্ডা।
হামলাকারীদের দাবি, ২০০৬ সালে জমিটি সমমনা দোকানদার সমিতি লি.কে বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা ২০২১ সালে ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটি রেজিস্ট্রি করে দেয়। সে সময়ে রাড্ডা এমসিএইচকে উচ্ছেদে একাধিকবার চিঠি ইস্যু করা হলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ কমিশনার কাসেম মোল্লা এবং অন্যদের কারণে উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। তাদের দাবি, মূল মালিকরা অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে নিজেদের জমি বুঝে নিয়েছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বলেন, সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি প্রায় ৫০ বছর ধরে এলাকার দরিদ্র, অসহায় ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে। এটি এলাকার হাজারো নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে প্রায় ২৫০ জন মুখোশধারী দুর্বৃত্ত ‘সম্মাননা দোকানদার সমবায় সমিতি লি.’-এর ব্যানারে ক্লিনিকে হামলা চালায়। প্রথমেই তারা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে। পরে তারা ক্লিনিকের মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ভ্যাকসিন, ফ্রিজ, এসি, নগদ টাকাসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে এবং স্থাপনা ভেঙে ফেলে। এতে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, হামলাকারীরা সরকারি ইপিআই টিকা, টিকা প্রদানের সরকারি রেজিস্টার ও নথি, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, নগদ প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা, প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি জেনারেটর, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি, সিসিটিভি ক্যামেরা, তিনটি স্টিলের আলমারি, পাঁচটি স্টিলের ফাইল কেবিনেট, ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি ও রিএজেন্ট, দুটি টিভি, দুটি কম্পিউটার, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টারসহ চেয়ার-টেবিল ও অন্যান্য আসবাবপত্র নিয়ে যায়। পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ১০ কাঠা জমি দখলের উদ্দেশ্যে এ হামলা চালানো হয়েছে। এ ঘটনায় ক্লিনিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। শনিবার থেকে ক্লিনিকটিতে সরকারি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল। এ ঘটনার পর হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ডা. নাসরিন আখতার। একই সঙ্গে সেন্টারের সম্পূর্ণ ক্ষতি পূরণ করে দেওয়াসহ দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বলেন, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে যা ঘটেছে, তা নিছক কোনো ডাকাতি বা হামলা নয়-এটি একটি সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসী কার্যক্রম, যা সমাজের অসহায় ও প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকার কেড়ে নেওয়ার একটি জঘন্য ষড়যন্ত্র। এই হামলা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত নয়; এটি এই দেশের প্রতিটি গরিব মা, প্রতিটি শিশু এবং প্রতিটি অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। জানতে চাইলে শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম যুগান্তরকে বলেন, হামলা ও ভাঙচুরের খবর পেয়ে রাতেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে উৎসুক জনতাকে জড়ো হয়ে থাকতে দেখেছেন। এ ঘটনায় হানিফ মিয়ার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা করেছে ভুক্তভোগীরা। আসামিদের বিরুদ্ধে অনধিকার প্রবেশ, চুরি, হুমকি এবং দেড় কোটি টাকার বেশি ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ আসামিদের ধরতে চেষ্টা করছে। এদিকে, দখলকারী (সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি) এক বিবৃতিতে জানায়, ২০০৬ সালে জমিটি তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং ২০২১ সালে ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটির পক্ষ থেকে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির নামে ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটি থেকে উচ্ছেদের জন্য কয়েক দফায় চিঠি ইস্যু করা হয়। কিন্তু তৎকালীন আওয়ামী লীগের আমলে কমিশনার কাসেম মোল্লা এবং অন্যান্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের কারণে উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিস্টরা পালিয়ে যাওয়ার পর জমিটি পরিত্যক্ত ছিল। সমিতির বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও এতদিন যাবৎ সমিতির সদস্যরা ভোগদখল করতে পারেননি। এখন সাধারণ সদস্য যারা ছিলেন, তারা সবাই মিলে সম্পূর্ণ বৈধভাবে তাদের জমিটি দখল করেছে।
