Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

বনায়ন কাগজে, মাঠে ভিন্ন ছবি

Advertisement

কায়েস আহমেদ সেলিম

কায়েস আহমেদ সেলিম

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বনায়ন কাগজে, মাঠে ভিন্ন ছবি

Advertisement

বন হওয়ার কথা ছিল মাঠজুড়ে, কিন্তু এর অস্তিত্ব মিলছে কেবল সরকারি নথিপত্রে। লাখ লাখ চারা রোপণের হিসাব থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর হদিস মিলছে না। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি, কেনা যন্ত্রপাতি ও নির্মিত অবকাঠামোর ব্যবহার নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। একইভাবে গাড়ি কেনায় লাখ লাখ টাকা দামের পার্থক্য এবং প্রকল্পের বিভিন্ন কেনাকাটায় বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি খরচ দেখানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগও রয়েছে। গাড়ি, ফটোকপি মেশিন, ল্যাপটপ ও মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে ল্যাবরেটরি স্থাপন, ভবন সংস্কার ও বনায়নে দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটির বিভিন্ন খাতে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। মোটরসাইকেল ও আসবাব কেনাকাটায় বড় অঙ্কের অনিয়ম ঘটেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ সহায়তায় নেওয়া ‘সুফল (টেকসই বন ও জীবিকা) প্রকল্প’ ঘিরে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। যুগান্তরের দীর্ঘ অনুসন্ধান, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ ও বক্তব্য এবং দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বন রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া এই প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের তথ্য দিতে বন অধিদপ্তর তথ্য অধিকার আইনেরও তোয়াক্কা করছে না। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী কোনো মন্তব্য করেননি। সুনির্দিষ্ট অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করে তথ্য ও নথি চাওয়া হলেও তথ্য দিতে গড়িমসি করছেন প্রধান বন সংরক্ষক।

মাঠে গাছ নেই, আছে হাতির অজুহাত : সুফল প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ ৩ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের বনায়ন হয়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।

দুদকের অনুসন্ধানসংক্রান্ত প্রতিবেদনে রামুর জোয়ারিয়ানালা বিটে কাগজে ৫১০ হেক্টর এলাকায় বনায়নের বিপরীতে বাস্তবে প্রায় ১৬০ হেক্টরে বনায়ন পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ কাগজের হিসাব ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যে প্রায় ৩৫০ হেক্টরের ব্যবধান। দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে শেরপুরের রাংটিয়া রেঞ্জের একটি এলাকার কথাও উঠে এসেছে। সেখানে কাগজে বনায়ন দেখানো হলেও মাঠে অল্পসংখ্যক গাছ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাতির আক্রমণ বা প্রাকৃতিক কারণে গাছের চারা নষ্ট হওয়ার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। বনসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উপগ্রহচিত্র, অবস্থান নির্ণায়ক তথ্য, আগের ও পরের সময়ের মাঠপর্যায়ের ছবি এবং রক্ষণাবেক্ষণ রেজিস্ট্রার পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।

গাড়ির দামে গলদ : সুফল প্রকল্পের যানবাহন কেনার ক্ষেত্রেও বড় প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য চারটি ফোর্ড পিকআপ প্রতিটি প্রায় ৫৭ লাখ টাকা দরে কেনা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের জন্য একই ধরনের পিকআপ প্রায় ৪৭ লাখ টাকা দরে কেনা হয়েছিল। দুই ক্রয়ের গাড়ির মডেল, কারিগরি বৈশিষ্ট্য, কর-শুল্ক ও অন্যান্য শর্ত একই হলেও চারটি গাড়িতে সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪০ লাখ টাকা।

ফটোকপি মেশিনে ৩ কোটি টাকা লোপাট : প্রকল্পের অধীনে ১২৮টি ফটোকপি মেশিন কেনার ক্ষেত্রেও হয়েছে দুর্নীতি। অভিযোগকারীদের হিসাবে, এসব মেশিন কেনায় ৩ কোটি ১০ লাখ ৯৭ হাজার টাকার অনিয়ম হয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করেছে, প্রতি ইউনিটের মূল্য কত, বাজারদর কত ছিল, দরপত্রে কত প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল এবং মূল্যায়ন কমিটি কী সুপারিশ করেছিল-এসব তথ্য যাচাই করলেই অভিযোগের সত্যতা স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছেন বনসংশ্লিষ্টরা।

মোটরসাইকেল-কম্পিউটার-ল্যাপটপে ৩৭ কোটি : মোটরসাইকেল, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও অফিসের আসবাবপত্র কেনাকাটায় প্রায় ৩৭ কোটি ১৬ লাখ ১৬ হাজার টাকার দুর্নীতি হয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, বাজারমূল্যের সঙ্গে ক্রয়মূল্যের পার্থক্য কত-এসব প্রশ্নের উত্তর রয়েছে ক্রয় নথি, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, সরবরাহ প্রতিবেদন ও গ্রহণপত্রে। বন অধিদপ্তরে এসব তথ্যের জন্য লিখিত আবেদন করা হলেও তথ্য মেলেনি।

বনভবন সংস্কারে ৮ কোটি ৬৬ লাখ : মহাখালীর বনভবন সংস্কারের নামে প্রায় ৮ কোটি ৬৬ লাখ ৩০ হাজার টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সংস্কারের প্রাক্কলন, দরপত্র, কার্যাদেশ, কাজের পরিমাপ, ঠিকাদারের বিল এবং চূড়ান্ত অর্থ পরিশোধের নথি যাচাই করলেই বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে এবং তার বিপরীতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তা বোঝা সম্ভব।

১৩ কোটি টাকার তিন ল্যাব, কিন্তু নেই প্রত্যাশিত চারা উৎপাদন : চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও যশোরে তিনটি টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি স্থাপনে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। টিস্যু কালচার প্রযুক্তির উদ্দেশ্য উন্নত ও রোগমুক্ত চারা উৎপাদন। কিন্তু কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ল্যাব স্থাপনের পরও প্রত্যাশিত মাত্রায় চারা উৎপাদন হয়নি। ফলে শুধু অর্থ ব্যয়ের হিসাব নয়, ল্যাবের যন্ত্রপাতি, জনবল, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনাও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

জাতীয় বন জরিপে ১৭ কোটি : প্রকল্পের আওতায় জাতীয় বন জরিপ বা ন্যাশনাল ফরেস্ট ইনভেন্টরিতে প্রায় ১৭ কোটি টাকা এবং নন-ডেট্রিমেন্টাল ফাইন্ডিংস কার্যক্রমে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব কাজের পরিধি কী ছিল, কী প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে, তার ফলাফল কী এবং সরকার সেই ফলাফল কীভাবে ব্যবহার করেছে-এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট নথিতেই রয়েছে।

এএনআরে ১৬ কোটি ৩৮ লাখ : সহায়তাপ্রাপ্ত প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম বা এএনআর পদ্ধতির বাগানের নামে ১৬ কোটি ৩৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ পদ্ধতিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছ ও চারাকে পরিচর্যার মাধ্যমে বেড়ে উঠতে সহায়তা করা হয়। বনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি সাইটে কী পরিমাণ প্রাকৃতিক চারা ছিল, কতটি পরিচর্যা করা হয়েছে এবং কতটি টিকে আছে-সাইটভিত্তিক তথ্য যাচাই করলেই প্রকৃত কাজের পরিমাণ বোঝা সম্ভব।

বাগানের ৬৩ কোটি টাকা ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন : সমৃদ্ধকরণ বাগানের নামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগও গুরুতর। এর পাশাপাশি অ-কাঠ বনজ পণ্য বা এনটিএফপিভিত্তিক বাগান তৈরির নামে ১৩ কোটি ১০ লাখ ৯৭ হাজার টাকা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো এলাকায় বাগান না করেই কাগজে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। দুই খাত মিলিয়ে এ ব্যয়ের পরিমাণ ৬৩ কোটি ১০ লাখ টাকা।

১৫ শতাংশের ‘কমিশন বলয়’ : প্রকল্পটি ঘিরে বন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। বন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। অভিযোগে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী, তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক ড. গোবিন্দ রায় এবং তৎকালীন বনমন্ত্রী শাহাব উদ্দিনের পরিবারের সদস্যদের নাম এসেছে। একাধিক বন কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পের ক্রয়, বনায়ন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় সক্রিয় ছিল। তাদের কয়েকজনের ভাষ্য, প্রকল্পের মোট বাজেট থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দেওয়ার চাপ ছিল। অভিযোগকারীদের একটি অংশের দাবি, প্রধান বন সংরক্ষকের জন্য ৫ শতাংশ, প্রকল্প পরিচালকের জন্য ৫ শতাংশ এবং তৎকালীন মন্ত্রীর পরিবারের সদস্যের জন্য ৫ শতাংশ-মোট ১৫ শতাংশ অর্থ অগ্রিম কমিশন হিসাবে ভাগাভাগির ব্যবস্থা ছিল। এছাড়া আরও বিভিন্ন খাতে অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই কমিশন বাণিজ্যের কারণেই পুরো প্রকল্পটি দুর্নীতির মহাসড়কে পরিণত হয়েছে।

দুদকের অভিযান : সুফল প্রকল্পের অনিয়মের অভিযোগ এখন শুধু অভিযোগের পর্যায়ে নেই; বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানেও এসেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বন অধিদপ্তরে অভিযান চালিয়ে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম নথি সংগ্রহ করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সুফল প্রকল্পের বনায়ন কার্যক্রমসহ বন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতি ও কাগজে-কলমে কাজ দেখানোর প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয়। সেখানে কাগজের হিসাবের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার পার্থক্য, কাজের অগ্রগতিতে অসংগতি এবং আর্থিক অনিয়মের প্রাথমিক তথ্যের কথাও উঠে আসে। এরপর ২০২৫ সালের আগস্টে সুফল প্রকল্পে দুর্নীতির তদন্ত শুরু করার খবর প্রকাশিত হয়। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও প্রকল্পটির বনায়ন কার্যক্রম নিয়ে দুদকের গভীর অনুসন্ধানের কথা এসেছে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম