Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

থার্ড টার্মিনাল চুক্তিতে চাপে বাংলাদেশ

জাপান ছাড়া বিকল্প নেই শর্ত দিচ্ছে ইচ্ছামতো

Advertisement

সাইফ আহমাদ

সাইফ আহমাদ

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জাপান ছাড়া বিকল্প নেই শর্ত দিচ্ছে ইচ্ছামতো

বিমানবন্দর। ফাইল ছবি

Advertisement

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য ১৬ ডিসেম্বর। নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। ঋণের কিস্তিও শুরু হয়েছে। অথচ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে কাটেনি অনিশ্চয়তা। উদ্বোধনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে-টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতির চেয়ে পরিচালনা চুক্তির জটিলতাই এখন বড় বাধা।

এ অবস্থায় কঠিন চার শর্তে দরকষাকষি আটকে দিয়েছে জাপানি কনসোর্টিয়াম। পরিচালনায় বিকল্প না রাখায় চূড়ান্ত আলোচনায় দুর্বল অবস্থানে বাংলাদেশ। দুই বছরে ২০ দফার বেশি বৈঠক করেও সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করতে বিষয়টি এখন সরকারের উচ্চপর্যায়ের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায়।

এদিকে উদ্বোধনের দিন কতটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে, তা নিয়েও একমত হতে পারেনি দুপক্ষ। প্রথমদিন অন্তত ১০টি নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করতে চায় বেবিচক। অন্যদিকে, জাপানি পক্ষের প্রস্তাব মাত্র চারটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুরু থেকেই বিকল্প অপারেটরের ব্যবস্থা না রাখায় একটি পক্ষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। এতে একের পর এক শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে কনসোর্টিয়াম। টার্মিনাল দ্রুত চালু করা জরুরি। তবে তাড়াহুড়ায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নয়। প্রস্তাবের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও শর্তগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার না দিলে বড় ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, থার্ড টার্মিনাল পরিচালনায় শুরু থেকেই বিকল্প ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন ছিল। তাহলে এখন বড় প্রশ্ন হলো-কেন আমরা একটি মাত্র অপারেটরকে বেছে নিলাম। এটি তো রহস্যজনক এবং মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। সঙ্গতকারণে দরকষাকষিতে দেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তির আর্থিক শর্ত, পরিচালন ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে টার্মিনাল চালু করা জরুরি। তবে দেশের স্বার্থ ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিশ্চিত না করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা ঠিক হবে না। নেগোসিয়েশনে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার জন্য আলোচনা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। নতুন কিছু শর্ত এসেছে। এক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত দরকার। আমরা বিষয়টি অবহিত করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। সবুজ সংকেত পেলে চুক্তি চূড়ান্ত হবে। আশা করছি দ্রুতই চুক্তি সম্পন্ন হবে।

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত যুগান্তরকে বলেন, ১৬ ডিসেম্বর উদ্বোধনের লক্ষ্যে আমরা কাজ এগিয়ে নিচ্ছি। যত দ্রুত সম্ভব চুক্তি সইয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হলেও হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি। চারটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তে ছাড় দিতে রাজি নয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও জাপানি কনসোর্টিয়াম। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প আন্তর্জাতিক অপারেটরকে বিবেচনায় না নেওয়ায় দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা শক্তিশালী ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিকল্প ব্যবস্থাপনার কার্যকর পরিকল্পনা থাকলে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারত। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন সরকার জানিয়েছিল, জাপানি কনসোর্টিয়াম শর্ত মেনে চুক্তি করতে রাজি না হলে অন্য আন্তর্জাতিক অপারেটর খোঁজা হবে।

বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাও বলেছিলেন, আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকলেও চুক্তিতে সমঝোতা না হলে দেশের স্বার্থ বিবেচনায় বিকল্প অপারেটরকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। পরবর্তী সময়ে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় বিকল্প অপারেটর নিয়োগের পথে এগোয়নি সরকার। তবে শেষ মুহূর্তে নতুন করে কয়েকটি শর্ত সামনে আসায় চুক্তি আবারও জটিলতায় পড়েছে।

সূত্রমতে, টার্মিনাল পরিচালনায় জাপানি কনসোর্টিয়ামের দেওয়া অমীমাংসিত চারটি শর্তের মধ্যে রয়েছে-গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়দায়িত্ব ও ঝুঁকি বণ্টন, রাজস্ব ভাগাভাগি, আইনি সুরক্ষা এবং প্রকল্পের ত্রুটি সংশোধনের দায়বদ্ধতার সময়সীমা। এসব বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় বেবিচক আলোচনার অগ্রগতি ও অমীমাংসিত শর্তগুলো লিখিতভাবে বিমান মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে।

এখন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে চুক্তির পরবর্তী অগ্রগতি। যদিও থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, কীভাবে আয় ভাগ হবে এবং পরিচালনার ঝুঁকি কে বহন করবে-এসব বিষয় প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও পরিচালনগত স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বিকল্প অপারেটর কিংবা অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা কতটা প্রস্তুত ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আবার বিকল্প অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা হলে নতুন করে দরপত্র, কারিগরি মূল্যায়ন, আর্থিক আলোচনা ও চুক্তি সম্পাদনের প্রয়োজন হতে পারে। এতে সময় বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য এবং চুক্তির শর্তে দেশের স্বার্থ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রাখা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে জাপানি কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব হলো, এ কার্যক্রমের সার্বিক দায়দায়িত্ব ও ঝুঁকি বহন করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। তবে এর বিপরীতে বিমানের আয়ের অংশ কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় কীভাবে পরিশোধ করা হবে; সে বিষয়ে নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে।

ফলে কার্যক্রমের দায়ভার, আর্থিক সুবিধা ও ক্ষয়ক্ষতির দায় বণ্টনের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত। দ্বিতীয় জটিলতা রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে। আগে বাংলাদেশকে ২৭ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার কথা থাকলেও অপারেশনাল প্রস্তুতির প্রথম আট মাসে সাড়ে ১৩ শতাংশ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে জাপানি পক্ষ। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে ওই সময়ে বাংলাদেশের রাজস্বের অংশ নির্ধারিত হারের তুলনায় অর্ধেকে নেমে আসবে।

এছাড়া আইনি সুরক্ষা ও দেশের আইন প্রয়োগের প্রশ্নেও দুপক্ষের অবস্থান ভিন্ন। চুক্তির ক্ষেত্রে জাপানি কনসোর্টিয়াম বিশেষ আইনি সুবিধা ও দায়মুক্তি চেয়েছে। তারা বলছে, ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগকারী বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকার সাধারণ কোনো আইন প্রণয়ন কিংবা বিদ্যমান আইন সংশোধন করলে সেটি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের অবস্থান হলো-দেশের প্রচলিত আইন এবং ভবিষ্যতে সাধারণভাবে প্রযোজ্য আইনি পরিবর্তনের বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না। এ ধরনের ছাড় দেওয়া হলে দেশের আইন প্রয়োগ, বিরোধ নিষ্পত্তি ও দায় নির্ধারণে কী প্রভাব পড়বে, তা চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে পর্যালোচনা করা জরুরি।

এছাড়া প্রকল্পের ত্রুটি সংশোধনের দায়বদ্ধতার সময়সীমা বা ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড (ডিএলপি) নিয়েও সমঝোতা হয়নি। বাংলাদেশ এ সময়সীমা ৯ মাস নির্ধারণ করতে চায়। অন্যদিকে, জাপানি কনসোর্টিয়াম তা বাড়িয়ে ১২ মাস করার দাবিতে অনড় রয়েছে।

বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অগ্রিম অর্থ পরিশোধ, আইনি সুরক্ষা, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের অর্থ পরিশোধ এবং যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে দায়দায়িত্বের বিষয়েও নতুন শর্ত তোলা হচ্ছে। আগে যন্ত্রাংশের দায়দায়িত্বের মেয়াদ ৬ মাসের কথা থাকলেও এখন ১২ মাস পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এ পরিস্থিতিতে চুক্তির প্রতিটি শর্তের আর্থিক ও আইনি প্রভাব পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বিকল্প ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনা, পরিচালনগত দায় বণ্টন এবং রাজস্বের নিশ্চয়তা সম্পর্কে স্পষ্ট অবস্থান ছাড়া চুক্তি চূড়ান্ত করা হলে ভবিষ্যতে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে। এখন সরকারের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে, কীভাবে দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি চূড়ান্ত করা হবে।

চুক্তি সইয়ে লাগবে আরও অন্তত এক মাস : তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিতে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) চুক্তি করবে বেবিচক। তবে বেবিচক ও জাপান কনসোর্টিয়ামের মধ্যে আলোচনা শেষ হলেও চুক্তি সইয়ের আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা বাকি রয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা জানান, কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

তিনি বলেন, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে তৃতীয় টার্মিনালের পরীক্ষামূলক উদ্বোধনের পরিকল্পনার সঙ্গে চুক্তি সইয়ের বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত নয়। উদ্বোধনী আয়োজনের প্রস্তুতির জন্য পৃথক একটি কমিটি কাজ করছে। এদিকে প্রথম দিন অন্তত ১০টি নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করতে চায় বেবিচক।

অন্যদিকে, জাপানি পক্ষের প্রস্তাব মাত্র চারটি ফ্লাইট। এর মধ্যে দুটি আগমন ও দুটি বহির্গমন। বিষয়টি চূড়ান্ত করতে ৩ নভেম্বর স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে ফ্লাইট পরিচালনার সংখ্যা নির্ধারণের পাশাপাশি তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ (ওঅ্যান্ডএম) চুক্তি সইয়ের তারিখও চূড়ান্ত হতে পারে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

থার্ড টার্মিনাল চুক্তিতে চাপে বাংলাদেশ জাপান ছাড়া বিকল্প নেই শর্ত দিচ্ছে ইচ্ছামতো

জাপান ছাড়া বিকল্প নেই শর্ত দিচ্ছে ইচ্ছামতো

বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য মধ্যস্বত্বভোগীর থাবা ফুলের বাজারেও

মধ্যস্বত্বভোগীর থাবা ফুলের বাজারেও

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ প্রতিদিন ঝরছে ২২ প্রাণ

প্রতিদিন ঝরছে ২২ প্রাণ

ঢামেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট রোগী ঢুকতে পারলেও বেরোনো কঠিন

রোগী ঢুকতে পারলেও বেরোনো কঠিন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম