এলডিসি উত্তরণের প্রভাব রপ্তানিতে
ঝুঁকি ৬৩৮ কোটি ডলারের
Advertisement
মনির হোসেন
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ দেশের অর্থনীতির জন্য একদিকে অগ্রগতির স্বীকৃতি, অন্যদিকে বড় পরীক্ষা। এতে রপ্তানিতে ৬৩৮ কোটি ডলারের ঝুঁকি রয়েছে। এতদিন উন্নত ও উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশের বাজারে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে পণ্য রপ্তানির যে সুবিধা পাওয়া গেছে, উত্তরণের পর তার একটি অংশ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। এতে রপ্তানি পণ্যের দাম বাড়তে পারে। কমতে পারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা। চাপ পড়তে পারে তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতে। একই সঙ্গে ওষুধের মেধাস্বত্ব, রপ্তানি প্রণোদনা ও আন্তর্জাতিক সহায়তার কিছু ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসবে। বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিআইও) ড. মোস্তফা আবিদ খান সম্প্রতি এক সেমিনারে এ তথ্য উপস্থাপন করেন। এই গবেষণার মূলভিত্তি হলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান।
জানতে চাইলে মোস্তফা আবিদ খান যুগান্তরকে বলেন, এলডিসি উত্তরণ আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। হয়তো তিন বছর সময় পাওয়া যাবে। কিন্তু এরপরও এটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন তিন বছর সময় পেলে তা ভালো ব্যবহার করতে হবে। এর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যে সংস্কার আনতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে। কোনো কিছুই নীতিমালায় আটকে রাখা যাবে না। বিশেষ করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। দক্ষতা না বাড়লে শিল্প আগাবে না। বর্তমানে এলডিসিভুক্ত ৪৯টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে এই তালিকা থেকে উত্তরণের কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে বাংলাদেশের আবেদনের পর তা দুই বছর পিছিয়ে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত করে জাতিসংঘের এ সংক্রান্ত কমিটি। তবে এলডিসি উত্তরণ হলে বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা কমে যাবে। এ কারণে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতে উত্তরণ প্রক্রিয়া আরও তিন বছর পেছানোর আবেদন করে। শিগগিরই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসবে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন চলতি মাসের মধ্যেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসবে। তিনি বলেন তিন বছর কীভাবে কাজে লাগানো হবে তারও একটি কর্মপরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে।
বিএফটিআইর প্রতিবেদনে বলা হয়, এলডিসি উত্তরণের পর কিছু বাণিজ্য সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। এতে রপ্তানি ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ কমবে। যার আর্থিক মূল্য ৬৩৮ কোটি ডলার। তবে এটি সম্ভাব্য ক্ষতির প্রাক্কলন, নিশ্চিত ক্ষতির হিসাব নয়। তবে কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও জাপানের মতো বড় বাজারে উত্তরণের পরও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল রাখার সুযোগ রয়েছে। জাপানের সঙ্গে ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সই হয়েছে। আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। এসব সুবিধা কাজে লাগানো এবং পণ্যের উৎপাদনশীলতা ও বৈচিত্র্য বাড়াতে পারলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
ইউরোপ-কানাডায় রপ্তানিতে বেশি ঝুঁকি : বিশ্লেষণে বলা হয়, এলডিসি উত্তরণের পর ক্ষতির বড় অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের বাজারে। সেখানে রপ্তানি কমতে পারে ২৬ দশমিক ২৮ শতাংশ। কানাডায় সম্ভাব্য পতন ৪২ দশমিক ০৫ শতাংশ। একইভাবে জাপানে ৩০ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ। চীনের বাজারে সম্ভাব্য পতন ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।
পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমেনি : বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য না আসা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি ছিল ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে ১১টি প্রধান পোশাক ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের রপ্তানি ছিল ২ হাজার ৫৭৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ, এসব পণ্যের অংশ ছিল মোট রপ্তানির ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এছাড়াও একই বছরে রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ছিল তুলা, সুতা ও বোনা (নিটিং) কাপড়ের তৈরি নানা পোশাক। ফলে কোনো নির্দিষ্ট বাজারে শুল্ক বৃদ্ধি বা প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের পণ্যের দাম বেড়ে গেলে রপ্তানিতে চাপ তৈরি হবে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, মৎস্য, কৃষিপণ্য, সিরামিক ও গৃহসজ্জার পণ্যের মতো খাতে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ খুঁজতে হবে। জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যেসব পণ্যের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা বেশি আসছে, ওইসব পণ্যে বিশেষ করে দিতে হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য এবং হস্তশিল্পের মতো পণ্যগুলোতে জোর দিতে হবে। এসব শিল্পের উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক এবং নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি পণ্যের বাজারজাতে বিভিন্ন দেশে আমাদের দূতাবাসগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।
কমছে বিনিয়োগ, দুর্বল হচ্ছে রাজস্বের ভিত্তি : এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকালে দেশের অর্থনীতির কয়েকটি সূচকও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিনিয়োগ। ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩২ দশমিক ০৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২৯ দশমিক ৩৮ শতাংশে। একই সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ থেকে কমে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১০ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে। একই সময়ে মোট দেশজ সঞ্চয় জিডিপির ২৫ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে কমে ২৩ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে। রাজস্ব আদায়ের অবস্থাও দুর্বল। জিডিপির অনুপাতে সরকারের মোট রাজস্ব ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৮ দশমিক ১ শতাংশে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই হার ছিল ৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
ওষুধের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা : এলডিসি হিসাবে বাংলাদেশ মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত কিছু আন্তর্জাতিক বিধান বাস্তবায়নে ছাড় পেয়েছে। উত্তরণের পর ডব্লিউটিওর বাণিজ্য-সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব অধিকারবিষয়ক চুক্তি (ট্রিপস) পুরোপুরি বাস্তবায়নের চাপ বাড়বে। বাংলাদেশের ওষুধশিল্প দেশের মোট ওষুধের চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণ করে। এ শিল্পে ইনসুলিন, হরমোন ও ক্যানসারের ওষুধের মতো উন্নত পণ্যও তৈরি হয়। কিন্তু উত্তরণের পর নতুন পেটেন্ট পাওয়া ওষুধ উৎপাদনে বিদেশি কোম্পানি বেশি রয়্যালটি দাবি করতে পারে। এর প্রভাব তিন থেকে চার বছর পর দৃশ্যমান হতে পারে। তবে আগে থেকে পেটেন্ট থাকা ওষুধের দাম তাৎক্ষণিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম। এছাড়া কপিরাইট-সংক্রান্ত বিধান মেনে চলার কারণে শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের ব্যবহৃত সফটওয়্যার ও বইয়ের খরচ বাড়বে।
সব আন্তর্জাতিক সহায়তা বন্ধ হবে না : এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের সব উন্নয়ন সহায়তা বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নয়। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাতিসংঘের অধিকাংশ সংস্থা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া অধিকাংশ সহায়তায় সরাসরি প্রভাব পড়ার কথা নয়। তবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণের শর্ত কিছুটা কঠিন হতে পারে। জার্মানির ক্ষেত্রে অনুদানের পরিবর্তে ঋণের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়বে। জলবায়ু তহবিল, প্রযুক্তি ব্যাংক এবং এলডিসির জন্য নির্ধারিত কিছু বিনিয়োগ সহায়তার সুযোগও হারাতে পারে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের চাঁদার পরিমাণ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। উদাহরণ হিসাবে, জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটে বাংলাদেশের অবদান বর্তমানে শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশের স্তরে রয়েছে। উত্তরণের পর তা আনুমানিক শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ হতে পারে।
বাজার সুবিধা ধরে রাখার সুযোগ : ঝুঁকি কমানোরও সুযোগ রয়েছে। যেমন উত্তরণের পরও চাইলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বড় কয়েকটি বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখা যায়। এর মধ্যে-কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও জাপান তিন বছরের জন্য এ সুবিধা বহাল রাখার সুযোগ দিয়েছে। চীন দুই বছরের মেয়াদ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত সব পণ্যে সুবিধা বহাল থাকবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যেসব বাজারে তিন বছরের জন্য সুবিধা অব্যাহত থাকবে, সেসব দেশে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ছিল প্রায় ২ হাজার ৯৩৮ কোটি ডলার। দুই বছরের জন্য সুবিধা বাড়তে পারে-এমন বাজারে রপ্তানি ছিল প্রায় ১৬০ কোটি ডলার। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিতে (আরসিইপি) যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
সংস্কারই উত্তরণের প্রস্তুতি : প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জন্য এখন প্রধান কাজ হলো সাময়িক বাজার সুবিধার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা গড়ে তোলা। নগদ রপ্তানি প্রণোদনা ও করছাড়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কারখানার আধুনিকায়ন, শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ ও শ্রমমান উন্নয়নে অর্থ ব্যয়ের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য ২০২৬-২০২৯ মেয়াদে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জাতীয় কর্মপরিকল্পনার কথা উল্লেখ রয়েছে। এতে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা, ব্যবসার নিয়ম সহজ করা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, রপ্তানি বৈচিত্র্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, বন্দর দক্ষতা, বিদেশি বিনিয়োগ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
