Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

রাজনীতিবিদ ও মানবাধিকারকর্মীর প্রতিক্রিয়া

দেশে এনে হাসিনার বিচার নিশ্চিত করতে হবে

Icon

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে এনে হাসিনার বিচার নিশ্চিত করতে হবে

জুলাই-আগস্টজুড়ে সংঘটিত গণহত্যা চালানোর অপরাধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা এবং বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী। তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলনে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে দেশজুড়ে সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে, যা বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ। এই গণহত্যার দায়দায়িত্ব এককভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রযন্ত্র, দলীয় ক্যাডার ও গুন্ডা বাহিনী ব্যবহার করে দেশব্যাপী গণহত্যা চালানো হয়। তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনের মধ্যদিয়ে গণহত্যার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি মিলল। এখন প্রয়োজন এই প্রতিবেদনের আলোকে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠন এবং প্রত্যর্পণ চুক্তির আলোকে শেখ হাসিনাকে দ্রুত ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করা।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে বুধবার প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার দপ্তরের তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে যুগান্তরের কাছে রাজনীতিবিদ ও মানবাধিকারকর্মীরা এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তথ্যানুসন্ধান দলের প্রতিবেদনে জুলাই-আগস্ট গণহত্যার জন্য শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পেয়েছে জাতিসংঘ। পহেলা জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো সরেজমিন অনুসন্ধান করে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদল।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। সঙ্গে ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও। নির্দেশনা পেয়ে আন্দোলন ঠেকাতে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে উঠেপড়ে লাগে নিরাপত্তা বাহিনীগুলো। পাশাপাশি জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণও পেয়েছে দলটি। বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচারে মারণাস্ত্র দিয়ে গুলি চালানো, গ্রেফতার, নির্যাতন, চিকিৎসা পেতে বাধা দেওয়ার মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ও বাংলাদেশের বাহিনীগুলো। এসব কারণে আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনকে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলছে জাতিসংঘ।

জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন সম্পর্কে মতামত জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বুধবার যুগান্তরকে বলেন, জুলাই-আগস্টের গণহত্যাসহ শেখ হাসিনার শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অজস্র ঘটনা ঘটেছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যার চিত্র উঠে এসেছে। এর বাইরেও কখনো প্রকাশ্যে, কখনো অপ্রকাশ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। আমরা চাই গণহত্যাসহ ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময়কার প্রতিটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার হোক। যারা এই ঘটনার মাস্টারমাইন্ড তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক। ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এর গতি আরও বাড়ানো হোক, যাতে নির্বাচনের আগেই বিচার করা সম্ভব হয়।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এ প্রসঙ্গে বুধবার যুগান্তরকে বলেন, জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রকৃত ও সত্য তথ্য উদ্ঘাটিত হলো। আমরা এতদিন ধরে যা বলে আসছি, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের এই প্রতিবেদন প্রকাশের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসী জানল যে জুলাই-আগস্টজুড়ে এবং এর আগে-পরে শেখ হাসিনা সরকারের সময় কি হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই-আগস্টে বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশু নিহত হওয়ার খবর দেশের মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়নি। যা জাতিসংঘের প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা গেছে। তিনি আরও বলেন, এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত শেখ হাসিনাসহ যারা, তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এটি করা গেলে আগামী দিনে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবেন কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকবেন, তারাও মানবাধিকার লঙ্ঘন না করার বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক হবেন।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বুধবার যুগান্তরকে বলেন, জুলাই-আগস্টজুড়ে এ দেশে যা হয়েছে তা নজিরবিহীন। শুধু জুলাই-আগস্ট কেন, প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনা যা করেছেন তা এককথায় নজিরবিহীন। গায়ের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকতে এত হত্যা, এত খুন-গুম, জেল-জুলম, দমন-পীড়ন-নির্যাতন পৃথিবীর খুব কম দেশের ইতিহাসে পাওয়া যাবে। এই অপরাধে শেখ হাসিনার বিচার হতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। বিচার না হলে ফ্যাসিজম ফিরে আসার সম্ভাবনা থেকেই যাবে।

এ প্রসঙ্গে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বুধবার যুগান্তরকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর এ দেশে জুলাই-আগস্টেই সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এই গণহত্যার দায়দায়িত্ব এককভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে গণহত্যা চালানো হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলও বাংলাদেশে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে। এ অবস্থায় আমরা মনে করি, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে যে কোনো মূল্যে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে। ভারত জাতিসংঘেরও সদস্য। তাই তাদের উচিত জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা। তা না হলে দুদেশের মধ্যে সামাজিক, রাজনৈতিক, এমনকি কূটনৈতিক সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব পড়বে। দুদেশের মধ্যে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে, তা কমবে না বরং সম্পর্ক আরও বাধাগ্রস্ত হবে।

গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বুধবার যুগান্তরকে বলেন, জুলাই-আগস্টজুড়ে এ দেশে যা হয়েছে তা আমাদের চোখের সামনেই হয়েছে। আমরা দেখেছি শেখ হাসিনা কিভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র এবং দলীয় ক্যাডার ও গুন্ডা বাহিনী ব্যবহার করে দেশব্যাপী গণহত্যা চালিয়েছে। আমরা যা দেখেছি জাতিসংঘের তদন্ত টিমের প্রতিবেদনে তাই উঠে এসেছে। জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে গণহত্যার বিষয়টি আন্তজার্তিকভাবে স্বীকৃতি পেল। তিনি আরও বলেন, এখন উচিত এই প্রতিবেদনের আলোকে শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা। আমরা মনে করি, এ দেশে শেখ হাসিনার আর রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই।

জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বুধবার যুগান্তরকে বলেন, জাতিসংঘের প্রতিনিধিদল মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে প্রতিবেদন দিয়েছে তা সত্যিই উদ্বেগজনক। জুলাই-আগস্টজুড়ে দেশব্যাপী গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। এরও আগে, এমনকি শেখ হাসিনার পতনের পরেও এদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এটা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে গুম-খুন-অপহরণ, দমন-পীড়ন এসব বন্ধ করতে হবে।

মানবাধিকারকর্মী ও গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন এ প্রসঙ্গে বুধবার যুগান্তরকে বলেন, জাতিসংঘের প্রতিনিধিদল নিজস্ব অনুসন্ধান করে জুলাই-আগস্টজুড়ে প্রায় দুই হাজার মানুষকে হত্যার তথ্য পেয়েছে। এর মধ্যে অনেক শিশুও রয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে গুলি করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে যেসব মারণাস্ত্র ব্যহার করা হয়, সেগুলো এই আন্দোলন দমাতে ব্যবহার করা হয়েছে। এটি সরাসরি সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের অনুমোদন, নির্দেশনা এবং নির্দেশেই হয়েছে, যা সুস্পষ্টভাবেই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। এই অপরাধে যুক্ত প্রত্যেকেরই তদন্ত সাপেক্ষে বিচার হওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত ব্যক্তি। তিনি ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। সাধারণ মানুষের ধারণা, ভারত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে না। অথচ পৃথিবীর বহু দেশে পলাতক স্বৈরাচারী সরকারের প্রধানকে নিজ দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার নজির রয়েছে। ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুপ্রতিম সম্পর্ক চায়, তাহলে তাদের উচিত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি শেখ মামুন

শেখ হাসিনা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম