ডিসি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা
সরকারের ছয় মাস শেষ খেলার জন্য প্রস্তুত
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে * বাজারদর নিয়ন্ত্রণে ডিসিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতে পারে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘সরকার মানেই মানুষকে হয়রানি করা-এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সরকার মানে হলো নাগরিকের সেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া, এটা নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘এই সরকারের ছয় মাস চলে গেছে। এটাকে আমি বলছি সরকারের প্রথম পর্ব। প্রথম পর্বের কোনো ভুল থাকলে সেটাকে ঠিকঠাক করে এখন আমরা খেলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।’ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে রোববার তিন দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৫-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ডিসিদের উদ্দেশে বলেন, তারা যেন সরকারপ্রধান বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অহেতুক স্তুতি বা প্রশংসা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসেন। এ সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা প্রশাসকদের সজাগ থাকার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা মস্ত বড় ইস্যু। এটা আমাদের এখন এক নম্বর বিবেচ্য বিষয়। এখানে যেন আমরা বিফল না হই। পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগবে না বলে জানান তিনি। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া, ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম, পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক ছাবেদ আলী প্রমুখ।
ডিসি সম্মেলনকে মহাশক্তিধর সমাবেশ উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা আজ যারা এখানে বসে আছি, তারাই সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশ সরকার। এটা মহাশক্তিধর একটি সমাবেশ। আমরা যা করি, চিন্তা করি, পরিকল্পনা করি; সেটিই সরকার, সরকারের চিন্তাভাবনা, কর্তব্য। এ মহাশক্তি নিয়ে আমরা কী কাজ করব, কী কাজের জন্য তৈরি, সফল-বিফল-সেগুলো আজকের সমাবেশের আলোচ্য বিষয়।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এটা নিয়ে জেলা প্রশাসকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতে পারে কার জেলায় বাজারদর কতটা ভালো নিয়ন্ত্রণে আছে। চাঁদাবাজি বা অন্য যেসব অসুবিধা থাকে, সেগুলো দূর করতে হবে।’ পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগবে না, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে বলেন, পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে এখন যে পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগছে না, এই তথ্য মাঠে-ঘাটে জনসাধারণের মধ্যে পৌঁছে দিতে হবে। পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানি হয়, এটি বন্ধ করতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম সনদের মতো পাসপোর্ট পাওয়া প্রতিটি মানুষের অধিকার।
নিজেদের মধ্যে সৃজনশীল কাজের প্রতিযোগিতা তৈরি করার আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসকদের বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সৃজনশীল কাজ করার সুযোগ তোমাদের পুরো মাত্রায় রয়েছে। আশা করি, তোমরা সেটা গ্রহণ করবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, বাজারদর নিয়ন্ত্রণ, জমির রেকর্ডপত্র থেকে শুরু করে অন্যান্য সেবা অনলাইনে প্রদান, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধিসহ সরকারি সেবাকে জনবান্ধব করার ক্ষেত্রে সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে সুস্থ প্রতিযোগিতা হতে পারে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, যে কোনো বয়সে এবং যে কোনো সময়ে একজন নাগরিক জন্ম সনদ চাইতে পারে। তাকে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। জন্ম সনদ একজন নাগরিকের দালিলিক প্রমাণ যে ওই ব্যক্তি এই দেশের নাগরিক। কারণ, এই জন্ম সনদ দিয়েই তার অন্যান্য কাজ করতে হবে। এটা না হলে জাতীয় পরিচয়পত্র হচ্ছে না, পাসপোর্ট হচ্ছে না। জন্ম সনদ পেতে কেউ হয়রানির শিকার হচ্ছে কি না, তা দেখতে হবে। সরকারকে একটা ‘খেলার টিম’ অভিহিত করে অধ্যাপক ইউনূস জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে বলেন, ‘সরকারকে যদি একটা ক্রিকেট বা ফুটবল টিমের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে এটা একটি টিম। এই সরকারের ছয় মাস চলে গেল, এটাকে আমি বলছি সরকারের প্রথম পর্ব। প্রথম পর্বের কোনো ভুল থাকলে সেটাকে ঠিকঠাক করে এখন আমরা খেলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। এখন কাজ হলো কর্মপদ্ধতি ঠিক করা। খেলা হলো একটা সামগ্রিক বিষয়। একজনের ভুলের কারণে অন্যরা সাফল্য থেকে বঞ্চিত হয়। পুরো টিমের সাফল্যটা গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। প্রস্তুতির কোথাও ঘাটতি থাকলে সেটাকে পূরণ করা দরকার।’ প্রধান উপদেষ্টা জেলা প্রশাসকদের ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে নিজের মতো করে মাঠ প্রশাসন পরিচালনার আহ্বান জানান। ডিসিদের উদ্দেশে বলেন, তারা যেন সরকারপ্রধান বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অহেতুক স্তুতি বা প্রশংসা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কাজগুলো আমাদের হাতে মাপা জিনিস। একই জিনিস ঘুরে-ফিরে বারবার আসছে। আমরা এমন অবস্থায় আছি, শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা মস্ত বড় ইস্যু। এটাতে আমরা কে কী পরিমাণ অগ্রসর হলাম, কী করণীয়, এক নম্বর বিবেচ্য বিষয় আইনশৃঙ্খলা। এটাতে আমরা যেন বিফল না হই। পুলিশ প্রশাসন, সিভিল প্রশাসনের কাজ কী, সমন্বয়ের কাজ কী, কিন্তু ‘ওর কারণে এটা হয় না’-এগুলো বলে আমরা পার পাব না। যেহেতু জেলার দায়িত্ব একজনের ওপর, তার সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হয় সবকিছু। কাজেই সমন্বয়ে কী সমস্যা, সেগুলো পরিষ্কার করে নিতে হবে, যাতে কাজ করতে গিয়ে আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে না যাই। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সব নাগরিকের সুরক্ষা বিধান করা সরকারের দায়িত্ব। আমরা এখন থেকে যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করব, সেখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং দেশের সব মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। নারী, শিশু, সংখ্যালঘুসহ সব নাগরিকের সুরক্ষা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। কে কোন মতবাদে বা রাজনৈতিক চেতনায় বিশ্বাসী, সেটা বিবেচ্য নয়। কারণ, সরকার দেশের সব মানুষের। তাই মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া আমার কাজ।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সেদিকে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনকে সজাগ থাকার নির্দেশ দেন তিনি। ড. ইউনূস বলেন, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়া মস্ত বড় দায়িত্ব। এ ইস্যুতে সারা দুনিয়া নজর রাখছে আমাদের ওপরে। একটা ছোট্ট ঘটনা সারা দুনিয়ায় চাউর হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘আমি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বলেছি, আপনারা সংখ্যালঘু হিসাবে কোনো কিছু দাবি করবেন না, দেশের নাগরিক হিসাবে দাবি করবেন। কারণ, দেশের নাগরিক হিসাবে সংবিধান আপনাকে যে অধিকার দিয়েছে, সেই অধিকার রাষ্ট্রের কাছে আপনার প্রাপ্য। এটা দাবি নয়, আপনার পাওনা।’
