Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

মিটফোর্ডে সোহাগ হত্যা

ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ থেকে নৃশংসতা

Advertisement

Icon

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ থেকে নৃশংসতা

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের (মিটফোর্ড) সামনে আলোচিত লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ হত্যার পেছনে আছে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব। আর ব্যবসাটি হলো পল্লী বিদ্যুতের চোরাই তারের। এ ব্যবসা নিয়ে সোহাগের সঙ্গে মাহমুদুল হাসান মাহিন ও টিটুর বিরোধ ছিল। এই দ্বন্দ্বেই সোহাগকে মারধর করছিল মাহিন-টিটুর নেতৃত্বাধীন লোকজন। এ সময় তারা তৈরি করেছিল মব পরিস্থিতি। সেখানে সোহাগের ওপর বড় পাথর নিক্ষেপ করে রিজওয়ান উদ্দিন অভি। সেই ভিডিও ভাইরাল হয় নেট দুনিয়ায়। কিন্তু অভি কেন এমন মধ্যযুগীয় নৃশংসতা চালাল? এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানতে পেরেছে, এর পেছনে রয়েছে এক বড় ট্র্যাজেডি। অভিকে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে এসেছে ওই ট্র্যাজেডির আদ্যোপান্ত।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অভি এক সময় মালয়েশিয়ায় ছিলেন। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেখান থেকে দেশে ফিরে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে মিটফোর্ড এলাকায় একটি ভাঙারির দোকান দেন। ওই দোকানটি দখল করে নেন সোহাগ। অভির একটি দামি মোবাইল ফোন ছিল। সেটিও নিয়ে নেন। সেই মোবাইলে কিছু স্পর্শকাতর ছবি ছিল। এগুলো দেখিয়ে প্রায়ই ব্ল্যাকমেইল করতেন সোহাগ। একবার অভিকে জিম্মি করে ৫০ হাজার টাকাও হাতিয়ে নেন সোহাগ। শুধু তাই নয়, অভির মোবাইলে থাকা স্পর্শকাতর ছবিগুলো তার (অভি) স্ত্রীকে পাঠান। এসব ছবি দেখে অভির স্ত্রী আত্মহত্যা করেন। এসব কারণে সোহাগের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি হয় অভির। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটান একের পর এক পাথর নিক্ষেপ করে।

জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, যে কোনো নৃশংস ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকে অনেক ক্ষোভ, দুঃখ আর বঞ্চনা। মঙ্গলবার রাতে অভিকে গ্রেফতারের পর প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, বহুল আলোচিত লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ হত্যায় নৃশংসতার পেছনেও সে ধরনের ক্ষোভ, দুঃখ আর বঞ্চনা আছে। যদিও যত ক্ষোভই থাকুক কোনো হত্যা-নৃশংসতা কাম্য নয়। বিষয়গুলো আমরা খতিয়ে দেখছি।

একই ধরনের তথ্য জানিয়ে, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এসএন নজরুল ইসলাম বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আমরা কয়েক ধরনের তথ্য পাচ্ছি। সব তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, মূলত পল্লী বিদ্যুতের চোরাই তারের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বে এই হত্যাকাণ্ড। অভি এখানে সুযোগ নিয়েছেন। নজরুল ইসলাম বলেন, সোহাগ গত সরকারের সময় সাবেক সংসদ-সদস্য হাজী সেলিমের ভাগনে পিল্লু কমিশনারের ছত্রছায়ায় বিদ্যুতের চোরাই তার কেনাবেচা করতেন। ৫ আগস্টের পর তার এই ব্যবসায় ভাগ বসাতে চান তারই পরিচিতজনরা। এ নিয়েই তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। যা থেকে মব সৃষ্টি করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। এতে নির্বাচনি বা রাজনৈতিক কোনো বিষয় নেই।

৯ জুলাই বিকালে মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের সামনে পাকা রাস্তার ওপর লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯) প্রকাশ্যে এলোপাতাড়ি আঘাত করে ও উপর্যুপরি পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হয়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে চকবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন। তারা দেখতে পান, ‘চাঁদাবাজদের জায়গা নাই, ব্যবসায়ীদের ভয় নাই’-স্লোগান দিচ্ছে সোহাগের ওপর হামলাকারীরা। এই মবের নেতৃত্ব দিচ্ছিল মাহিন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকেই মাহিনকে গ্রেফতার করে। ঘটনাস্থলের পাশ থেকে রবিন নামে আরেকজনকে গ্রেফতার করে। পরে গ্রেফতার করা হয় আরও সাতজনকে।

বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার জানান, মামলাটি তদন্তকালে প্রাথমিকভাবে উপর্যুপরি পাথর নিক্ষেপ করা অভিকে (৩১) চিহ্নিত করা গেলেও সেই সময় তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। পরে পুলিশের বিশেষ টিমের সহায়তায় তার পরিচয় নিশ্চিত হয়। এরপর অবস্থান চিহ্নিত করে মঙ্গলবার রাতে তাকে পটুয়াখালী থেকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি বলেন, সোহাগ হত্যা মামলার এজাহার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে এজাহারের একটি কপি ছড়িয়ে পড়েছে। এটি ভিকটিমের সাবেক স্ত্রী ও সৎভাইয়ের প্রস্তুত করা এজাহারের খসড়া। ওই খসড়ায় ২৩ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে মামলার বর্তমান বাদী ভিকটিমের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম থানায় এসে মামলা করেন। এ সময় বাদীর মেয়ে ওই খসড়া এজাহারের ছবি তুলে রাখে। পরে ভিকটিমের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম খসড়া এজাহার থেকে পাঁচজনের নাম বাদ দিয়ে নতুন একজনের নাম সংযোজন করে মোট ১৯ জনকে আসামি করে চূড়ান্ত এজাহার দায়ের করেন। এর ভিত্তিতেই কোতোয়ালি থানায় নিয়মিত মামলা হয়।

শেখ সাজ্জাত আলী বলেন, এই নারকীয় ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি এ ধরনের অপরাধের যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের যে কোনো নাগরিকের রাজনৈতিক পরিচয় থাকতেই পারে। সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। এ ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক কার্যক্রমের সংশ্লিষ্টতা নেই।

সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অ্যাডমিন) ফারুক আহমেদ, লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, মিডিয়া বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যা মামলায় তিনজন রিমান্ডে : ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় তিন আসামির সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। আসামিরা হলেন-নান্নু কাজী, রেজওয়ান উদ্দিন ওরফে অভি ও তারেক রহমান রবিন। বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুজ্জামান শুনানি শেষে রিমান্ডের এ আদেশ দেন। এ তিনজনের মধ্যে অভিকে মঙ্গলবার রাতে পটুয়াখালী থেকে গ্রেফতার করা হয়।

তিনজনকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান ১০ দিন করে রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। শুনানির পর আদালত সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাইয়ুম হোসেন নয়ন বলেন, আসামিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। এর আগে ১০ জুলাই মাহমুদুল হাসান মহিন ও তারেক রহমান রবিনকে রিমান্ডে পাঠানো হয়। অস্ত্র মামলায় দুই দিনের রিমান্ডে রবিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। শনিবার টিটন গাজীকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়। রোববার মো. আলমগীর ও মনির ওরফে লম্বা মনিরের চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। সোমবার দুই ভাই সজীব ব্যাপারী ও রাজীব ব্যাপারীকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়। মঙ্গলবার মহিনকে আবারও পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়। পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি জানান, মঙ্গলবার পটুয়াখালী সদর উপজেলার ইটবাড়িয়া এলাকা থেকে সোহাগ হত্যা মামলার আসামি অভিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পটুয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাজিদুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার রাত পৌনে ১২টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ও প্রযুক্তির সহায়তায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) অভিকে গ্রেফতার করে।

উল্লেখ্য, ৯ জুলাই সন্ধ্যায় রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের সামনে রাস্তার ওপর একদল সন্ত্রাসী ব্যবসায়ী সোহাগকে পাথর দিয়ে মাথায় আঘাত করে এবং কুপিয়ে হত্যা করে। সোহাগ হত্যার ঘটনায় তার বড় বোন বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। এ মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

Advertisement

হত্যা

Advertisement

আরও পড়ুন

বড়াইগ্রামে বাস-ট্রাক সংঘর্ষ ঘুম থেকে চিরঘুমে ১২ প্রাণ

ঘুম থেকে চিরঘুমে ১২ প্রাণ

রাজশাহী, রংপুর ও চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী পতিত স্বৈরাচার ও বিরোধী দল এক হয়ে ষড়যন্ত্র করছে

পতিত স্বৈরাচার ও বিরোধী দল এক হয়ে ষড়যন্ত্র করছে

খালার বাড়ি যাওয়া হলো না দুই শিশুর বাবা-মেয়ের মৃত্যু মা-ছেলে হাসপাতালে

বাবা-মেয়ের মৃত্যু মা-ছেলে হাসপাতালে

বাঁওড় এলাকায় মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প তিন কোটি টাকার মাছ ছাড়তে খরচ ৪৫ কোটি

তিন কোটি টাকার মাছ ছাড়তে খরচ ৪৫ কোটি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম