Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

রাজনৈতিক দলের কাছে জুলাই সনদের সমন্বিত খসড়া

কোনো আদালতে প্রশ্ন নয়

বিধান, প্রস্তাব বা সুপারিশের ব্যাখ্যাসংক্রান্ত প্রশ্নের চূড়ান্ত মীমাংসার এখতিয়ার সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের * বাস্তবায়নযোগ্য অংশ নির্বাচনের আগেই কার্যকর * ২০ আগস্টের মধ্যে মতামত জানাতে হবে; এর আলোকে চূড়ান্ত

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কোনো আদালতে প্রশ্ন নয়

Advertisement

বহু কাঙ্ক্ষিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর সমন্বিত খসড়া চূড়ান্ত করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদের যেসব সুপারিশ অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হবে। খসড়ার অঙ্গীকারে জুলাই সনদকে সর্বোচ্চ আইনি ভিত্তি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর প্রতিটি বিধান, প্রস্তাব ও সুপারিশ সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে বলবৎ হিসাবে গণ্য হবে। ফলে এর বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা, কিংবা জারির কর্তৃত্ব সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। সনদের কোনো বিধান, প্রস্তাব বা সুপারিশের ব্যাখ্যাসংক্রান্ত যে কোনো প্রশ্নের চূড়ান্ত মীমাংসার এখতিয়ার থাকবে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের ওপর। 

খসড়া সনদের কপি শনিবার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে। দলগুলোকে ২০ আগস্ট বুধবার বিকাল ৪টার মধ্যে মতামত জানাতে বলা হয়। দলগুলোর মতামতের আলোকে এটি চূড়ান্ত হবে। খসড়ায় তিনটি অংশ আছে। প্রথম অংশে সনদের পটভূমিতে পাঁচটি প্রস্তাবনা, দ্বিতীয় অংশে ঐকমত্য হওয়া ৮৪টি সিদ্ধান্ত এবং তৃতীয় অংশে আটটি অঙ্গীকার রয়েছে। আবার ঐকমত্য হওয়া ৮৪টির মধ্যে ১৩টি নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) রয়েছে। এর মধ্যে ৯টিতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। যার মধ্যে রয়েছে-প্রধানমন্ত্রী হলে দলীয় পদে থাকা যাবে না। এছাড়াও খসড়ায় রাষ্ট্রের সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন বিষয়ে যেসব সংস্কারে ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে। 

অঙ্গীকারনামা : সনদের সমন্বিত খসড়ায় অঙ্গীকারনামায় উল্লেখ করা হয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হতে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে কার্যত কোনো সংবিধান ছিল না। এরপরও ওই সময়ের সব কার্যক্রম মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৭২ সালের সংবিধানে সন্নিবেশিত করে আইনি ও সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হয়। একইভাবে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণ-অভ্যুত্থানোত্তর সময়ে প্রধান বিচারপতি পদত্যাগ করে উপরাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নেন। এরপর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি পদের দায়িত্ব গ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে প্রধান বিচারপতি পদে ফিরে যাওয়াসংক্রান্ত কোনো আইনি কাঠামো ছিল না। কিন্তু রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর রূপরেখা ও অঙ্গীকারের ভিত্তিতে ওই ধরনের কার্যক্রমকে বৈধতা দিয়ে পরবর্তী সংসদে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে সাংবিধানিক কনভেনশন এবং গণতন্ত্রকে সংহত করা হয়; 

খসড়ায় আরও বলা হয়, একইভাবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনগণের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সাংবিধানিক কনভেনশন বজায় রেখে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে জনগণের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো যেসব অঙ্গীকার করবে, সেগুলো হচ্ছে- ১. জনগণের অধিকার ফিরে পাওয়া এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে হাজারো মানুষের জীবন ও রক্তদান এবং অগণিত মানুষের সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি ও ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত সুযোগ এবং জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসাবে ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দলিল হিসাবে জাতীয় সনদের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করা। ২. রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। তাদের অভিপ্রায় সর্বোচ্চ আইন এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে। তাই রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে জুলাই সনদ প্রণয়ন করবে। পাশাপাশি সনদের সব বিধান, নীতি ও সিদ্ধান্ত সংবিধানে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করবে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান সংবিধান বা অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর কিছু থাকলে সেই ক্ষেত্রে এই সনদের বিধান/প্রস্তাব/সুপারিশ প্রাধান্য পাবে। ৩. সনদের কোনো বিধান, প্রস্তাব বা সুপারিশের ব্যাখ্যাসংক্রান্ত যে কোনো প্রশ্নের চূড়ান্ত মীমাংসার এখতিয়ার বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের ওপর ন্যস্ত থাকবে। ৪. প্রতিটি বিধান, প্রস্তাব ও সুপারিশ সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে বলবৎ হিসাবে গণ্য হবে। ফলে এর বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা, কিংবা জারির কর্তৃত্ব সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। ৫. সনদে উল্লিখিত দেশের সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন, জনপ্রশাসন, পুলিশি ব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার বিষয়ে যেসব প্রস্তাব/সুপারিশ লিপিবদ্ধ রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন, লিখন ও পুনর্লিখন এবং বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন, পরিবর্তন, পরিমার্জন, লিখন, পুনর্লিখন বা নতুন আইন প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন বা বিদ্যমান বিধি ও প্রবিধির পরিবর্তন বা সংশোধন করা হবে ৬. গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জনগণের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম এবং বিশেষত; ২০২৪ সালের অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সাংবিধানিক তথা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ৭. ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডের বিচার, শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান ও শহীদ পরিবারগুলোকে যথোপযুক্ত সহায়তা প্রদান এবং আহতদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনে ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। ৮. এই সনদের যেসব সুপারিশ অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করেই পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করবে।

যেসব বিষয়ে একমত : রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনায় ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। তবে ১৪টি সিদ্ধান্তে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বিভিন্ন দল। এর মধ্যে ৯টি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বিএনপি। ঐকমত্যে পৌঁছানো বিষয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-রাষ্ট্রভাষা, নাগরিকত্ব ও সংবিধান। এছাড়াও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং মৌলিক অধিকারের বিষয়ে যেসব প্রস্তাবে সম্মিলিতভাবে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো হলো-১. সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ২. নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ ৩. রাষ্ট্রপতির ক্ষমা-সম্পর্কিত বিধান ৪. বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ-(ক) সুপ্রিমকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ (খ) উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালতের সম্প্রসারণ ৫. জরুরি অবস্থা ঘোষণা ৬. প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ৭. সংবিধান সংশোধন ৮. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল, ৯. নির্বাচন কমিশন গঠন ১০. পুলিশ কমিশন গঠন ১১. নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ-সম্পর্কিত। এ ছাড়া বাকি ৯টি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্টসহ (ভিন্নমত) সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো-১. সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০ সংশোধন ২. প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান ৩. সরকারি কর্মকমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান সম্পর্কিত ৪. সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব (সংখ্যা বৃদ্ধি, নির্বাচন পদ্ধতি ইত্যাদি) ৫. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা (উচ্চকক্ষের গঠন, সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি, এখতিয়ার ইত্যাদি) ৬. রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি ৭. তত্ত্বাবধায়ক সরকার ৮. রাষ্ট্রের মূলনীতি ৯. রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব [অনুচ্ছেদ ৪৮(৩)]। 

সংবিধান সংশোধন : সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সংসদের উভয়কক্ষের (নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে। তবে সুনির্দিষ্ট কতগুলো অনুচ্ছেদ যেমন ৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, (যেটি সংবিধানে যুক্ত হবে তা) সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে। এক্ষেত্রে ৩০টি দল ও জোট একমত। 

জরুরি অবস্থা ঘোষণা : ১. জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে ১৪১ক অনুচ্ছেদ সংশোধনের সময় ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগের’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার প্রতি হুমকি বা মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে ২. যুক্ত হবে জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের বিধান। জরুরি অবস্থা ঘোষণা সম্পর্কিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা অথবা তার অনুপস্থিতিতে বিরোধীদলীয় উপনেতার উপস্থিতি অন্তর্ভুক্ত হবে। 

নাগরিক পরিচয় : দেশের নাগরিকরা ‘বাংলাদেশি’ বলে পরিচিত হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার, গণতন্ত্র এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’ উল্লেখ থাকবে। সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদার প্রশ্নে সংবিধানে যুক্ত করা হবে যে, ‘বাংলাদেশ একটি বহু-জাতি, বহু-ধর্মী, বহু-ভাষী ও বহু-সংস্কৃতির দেশ যেখানে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।’

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি : রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংসদের উভয়কক্ষের (নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ) সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন। এক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। 

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব : রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনয়নের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) সংশোধনীর প্রস্তাব করে কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারবলে রাষ্ট্রপতি যেসব পদে নিয়োগ দিতে পারবেন, সেগুলো হলো-১. জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য ২. তথ্য কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য ৩. বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্য ৪. আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য ৫. বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ৬. এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য। তবে ৫ ও ৬ নং ক্রমিকের বিষয় বিএনপিসহ কয়েকটি দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে। আইনসভার নিম্নকক্ষে অভিশংসন প্রস্তাবটি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে পাশ করার পর তা উচ্চকক্ষে পাঠানো হবে। উচ্চকক্ষে শুনানির মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে অভিশংসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী : একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর পদে সর্বোচ্চ মেয়াদ ১০ বছর থাকতে পারবেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান, যেমন একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না-এমন বিধান সংবিধানে যুক্ত করা হবে। এই বিধানে ভিন্নমত রয়েছে বিএনপিসহ তিনটি দলের। 

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা : সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংসদের মেয়াদ অবসান হওয়ার ১৫ দিন আগে মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে, ভঙ্গের পরবর্তী ‘১৫’ দিনের মধ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ চূড়ান্ত করা হবে। সংসদের মেয়াদ অবসানের ক্ষেত্রে এর ৩০ দিন আগে স্পিকারের তত্ত্বাবধানে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দলের) এবং সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধিসহ মোট পাঁচ সদস্য সমন্বয়ে একটি কমিটি হবে। এই কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাই করবে। কমিটির যেকোনো বৈঠক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সভাপতিত্ব করবেন স্পিকার। কমিটি গঠনের পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কমিটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র এমপিদের কাছ থেকে সংবিধানের ৫৮গ অনুচ্ছেদে বর্ণিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির নাম প্রস্তাবের আহ্বান করবেন। এক্ষেত্রে প্রতিটি দল একজন এবং স্বতন্ত্র সদস্য একজন ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করতে পারবেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ হবে অনধিক নব্বই দিন। তবে দৈব-দুর্বিপাকজনিত কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হলে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আরও সর্বোচ্চ ত্রিশ দিন দায়িত্ব পালন করতে পারবে।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইন সভা : একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইন সভা থাকবে। নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) এবং উচ্চকক্ষ (সিনেট) ১০০ সদস্য নিয়ে গঠিত হবে। নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের ১০০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। দলগুলো নিম্নকক্ষের সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের সময় উচ্চকক্ষের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে। তালিকায় কমপক্ষে ১০% নারী প্রার্থী থাকতে হবে। এক্ষেত্রে ভিন্নমত দিয়েছে বিএনপি। 

নির্বাচনব্যবস্থা : প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত সংখ্যক নির্বাচন কমিশনারগণের সমন্বয়ে বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকবে। আইনের দ্বারা নিম্নরূপে গঠিত একটি বাছাই কমিটির মাধ্যমে উপযুক্ত প্রার্থী বাছাই করা হবে। ১. জাতীয় সংসদের স্পিকার (যিনি এই বাছাই কমিটির প্রধান হবেন) ২. ডেপুটি স্পিকার (যিনি বিরোধী দল হতে নির্বাচিত হবেন) ৩. প্রধানমন্ত্রী ৪. বিরোধী দলের নেতা এবং ৫. প্রধান বিচারপতির প্রতিনিধি হিসাবে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি।

বিচার বিভাগ : প্রধান বিচারপতি নিয়োগে সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি হিসাবে নিয়োগদান করবেন। এখানে শর্ত দেওয়া হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তবে তারা সংবিধানে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম দুজন বিচারপতির মধ্য হতে যেকোনো একজনকে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দান করবেন মর্মে বিধান সংযোজন করতে পারবে। বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হবে। 

পটভূমি : সনদের পটভূমিতে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামজিক সুবিচারের নীতিকে ধারণ করে যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের আকাঙ্ক্ষা দেশের জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, দীর্ঘ ৫৩ বছরেও তা অর্জন করা যায়নি। ‘রাষ্ট্রকাঠামোতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের’ মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকরী ও বিচারহীনতার সহায়ক হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকার ‘জনস্বার্থের বিরুদ্ধে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার উদ্দেশ্যে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানের বিকৃতি সাধন, বিভিন্ন নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়ন, নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ধ্বংস, বিচার বিভাগ ও জনপ্রশাসনকে দলীয়করণ এবং দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের ব্যবস্থা কায়েম করে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের জনগণের সম্মিলিত শক্তি ও প্রতিরোধের কাছে স্বৈরাচারী শাসক ও তার দোসররা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এরপর জনগণের মননে রাষ্ট্র-কাঠামো পুনর্গঠনের এক প্রবল অভিপ্রায় সৃষ্টি হয়েছে।


Advertisement

জুলাই সনদ

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম