চট্টগ্রাম বন্দরে অস্বাভাবিক ট্যারিফ আরোপের প্রস্তাব
ঋণের বোঝার খেসারত কেন দেবেন ব্যবসায়ীরা
এক লাফে ৪১ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফ বাড়ানোর প্রস্তাব প্রায় সব খাতে * সেবার মান না বাড়িয়ে এহেন তৎপরতায় ক্ষুব্ধ সেবাপ্রার্থীরা
Advertisement
শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রাম বন্দরে অস্বাভাবিক ট্যারিফ বা মাশুল বাড়ানোর উদ্যোগে ব্যবসায়ীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজ করছে। বন্দরের মাতারবাড়ি চ্যানেল তৈরির বিপরীতে জাইকা থেকে নেওয়া ঋণসহ বিভিন্ন প্রকল্পের দায়দেনা পরিশোধ ও অপারেশনাল ব্যয় সামাল দিতে বন্দরের মাশুল ‘আপগ্রেড’ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এভাবে মাশুল বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে ভুক্তভোগী ও সেবাপ্রার্থী ব্যবসায়ী নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, বন্দর এত বছর যে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করেছে সেই টাকা কোথায় গেল? এখন এসব খরচের জোগান দিতে তারা তো সরকারের সেবা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানাতে পারেন না। বন্দর ব্যবহারকারীরা আরও বলেন, কার্যত বন্দরের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা কমাতে কর্তৃপক্ষ অস্বাভাবিক মাশুলের চাপ ব্যবসায়ীদের কাঁধে তুলে দিচ্ছে। কিন্তু সেবা না বাড়িয়ে এক লাফে বিভিন্ন খাতে ৪১ শতাংশ মাশুল বৃদ্ধির প্রস্তাব হাস্যকর।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, চট্টগ্রাম বন্দরের সেবার মান আগের চেয়ে অনেকাংশে বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজের গড় অবস্থান সময় কমে এসেছে। কনটেইনার রাখার ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি করা হয়েছে। আরও নতুন নতুন ইয়ার্ড নির্মাণ করা হচ্ছে। সবমিলিয়ে বন্দরের এসব কার্যক্রমের ফলে আমদানি-রপ্তানি পণ্য সহজেই জাহাজীকরণ, খালাস কিংবা ডেলিভারি সম্ভব হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিশ্বের উন্নত দেশের বন্দরের তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল অনেক কম। দীর্ঘ ৪০ বছর পর মাশুল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ৫০টিরও বেশি সেবা খাতে বন্দর কর্তৃপক্ষ মাশুল বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। এসব খাতে বিদ্যমান মাশুলের চেয়ে সর্বনিম্ন ৩৪ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭৫২ শতাংশ পর্যন্ত মাশুল বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ মাশুল বৃদ্ধির প্রস্তাব গড়ে ৪১ শতাংশ। প্রস্তাবিত মাশুল কার্যকর করার আগে সোমবার নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা বৈঠকে ব্যবসায়ীরা বন্দরের সেবা কতটুকু বেড়েছে সে প্রশ্ন সামনে আনেন। তবে নৌ পরিবহণ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন ৫ সেপ্টেম্বর বন্দর সেবার চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ওই বৈঠকের পরই মাশুল পুনর্নির্ধারণে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন বলে ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেন তিনি।
প্রস্তাবিত মাশুলের ছক পর্যালোচনা করে দেখো গেছে, সবচেয়ে বেশি মাশুল বাড়ানো হয়েছে কনটেইনার পরিবহণে। বর্তমানে ২০ ফুট সমমানের প্রতিটি কনটেইনারে গড়ে ১১ হাজার ৮৪৯ টাকা মাশুল আদায় করা হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী কনটেইনারপ্রতি বাড়তি মাশুল দিতে হবে গড়ে ৪ হাজার ৩৯৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি আমদানি কনটেইনারে মাশুল বাড়বে ৫ হাজার ৭২০ টাকা এবং রপ্তানি কনটেইনারে বাড়বে ৩ হাজার ৪৫ টাকা। এছাড়া পোর্ট ডিউস, টাগ চার্জ, হায়ার অফ টাগস, বার্থিং-আনবার্থিং চার্জ, ওয়াটার সাপ্লাই চার্জ, বার্থ অক্যুপেন্সি, মর্নিং অক্যুপেন্সি, জেটি ক্রেন চার্জ, কি গ্যান্ট্রি ক্রেন, রিভার ডিউজ, ল্যান্ডিং অর শিপিং চার্জ, হোস্টিং চার্জ, হায়ার অব মেকানিক্যাল ইক্যুইপমেন্টস অ্যাপ্লায়েন্স অ্যান্ড ভেহিক্যালস চার্জ-এভাবে অর্ধশতাধিক খাতে বন্দর মাশুল আদায় করে। প্রায় সব খাতেই বাড়তি চার্জ বা মাশুল আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান অর্থ ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত এক প্রস্তাবনায় মাশুল বৃদ্ধির গোপন রহস্য বেরিয়ে এসেছে। বলা হয়েছে, ১৯৮৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং প্রায় ২১৯৭ শতাংশ বেড়েছে। ইয়ার্ড ক্যাপাসিটি ১৬৮ শতাংশ ও অপারেশনাল ব্যয় ৬৯২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মহেশখালীর মাতারবাড়ি চ্যানেল চবকের কাছে হস্তান্তর করার বিপরীতে জাইকা থেকে ঋণ হিসাবে ৯৩৫০ দশমিক ৬১ কোটি টাকা চবককে পরিশোধ করতে হবে। বে-টার্মিনালের জন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সঙ্গে ৬৫০ মিলিয়ন ইউএস ডলার ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। ডিপিপি অনুযায়ী নিজস্ব তহবিল থেকে ৪৬৩৭ দশমিক ৪০ কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। উক্ত ঋণ পরিশোধ এবং ভবিষ্যতে চবকের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অব্যাহত রাখার জন্য এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে বন্দরসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চবকের ট্যারিফ বা মাশুল আপগ্রেড করা জরুরি। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এশিয়ার ১০টি বন্দরসহ ১৭টি আন্তর্জাতিক বন্দরের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ও বিদ্যমান ট্যারিফ, চবকের অপারেশনাল এবং প্রকল্প ব্যয় পর্যালোচনা করে নতুন ট্যারিফ নির্ধারণ করে।
বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ কিংবা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবসায়ীদের গলায় পাড়া দিয়ে টাকা নিতে কে বলেছে বন্দরকে। বন্দর এত বছর যে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করেছে সেই টাকা কোথায় গেল? সেবা প্রতিষ্ঠানকে তো তারা এভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানাতে পারেন না।’ তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ী নেতারা নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ শতাংশ মাশুল ধার্য করার প্রস্তাব দিয়েছেন। আশা করছি সরকার সেই প্রস্তাবে রাজি হবে।’
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সাবেক পরিচালক খাইরুল আলম সুজন যুগান্তরকে বলেন, বন্দরের বিভিন্ন মাশুল আদায় করা হয় ইউএস ডলারে। আগামীতে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল-এনসিটি ও বে-টার্মিনালসহ অন্তত চারটি টার্মিনাল বিদেশি অপাটেরদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। বাড়তি মাশুলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেই বিদেশিদের ডেকে আনা হচ্ছে কিনা আমার সন্দেহ। ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলংকার বন্দরে যেসব সুবিধা আছে তা চট্টগ্রাম বন্দরে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে শুল্কায়ন জটিলতার কারণেই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কনটেইনার পড়ে থাকে।’
সেবা সম্পর্কে চট্টগ্রাম বন্দরের বক্তব্য : চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান সেবা কার্যক্রম সম্পর্কে একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে অবস্থানরত জাহাজের গড় অপেক্ষমাণ সময় শূন্য থেকে ২ দিনে নেমে এসেছে। আগে যেখানে সপ্তাহখানেক পর্যন্ত একটি জাহাজকে অপেক্ষা করতে হতো, এখন তা করতে হচ্ছে না। অবস্থান সময় কমার কারণে আমদানিকারকরা যেমন দ্রুত পণ্য খালাস করতে পারছেন, তেমনি ভাবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে ইয়ার্ডগুলো সম্প্রসারণের ফলে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতা বেড়েছে। আগে বন্দরের ধারণক্ষমতা ছিল ৫৩ হাজার ৫১৮ টিইইউএস। এখন সেটি ৫৯ হাজার টিইইউএ-এ উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ আগের চেয়ে কনটেইনার সংরক্ষণ ক্যাপাসিটি বেড়েছে ৫ হাজার ৪৮২টি।
