Logo
Logo
×

Advertisement

স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা

বাংলাদেশের পতাকার জন্ম

Advertisement

Icon

সালেহ উদ্দিন আহমদ

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

’৭১-এর ২ মার্চ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর ভরে গেল ছাত্র-জনতার উত্তাল স্রোতে। খুব সকাল মিছিলের পর মিছিল আসছে। সিদ্ধান্ত হলো, বটতলার চিরাচরিত মঞ্চ ব্যবহার না করে মিছিল পরিচালনা করা হবে কলাভবনের সামনের পশ্চিম পাশে গাড়িবারান্দার স্থান থেকে। দুপুর ২টা ১০ মিনিটে আ স ম আবদুর রব উড়ালেন বাংলাদেশের স্বাধীন পতাকা। স্তম্ভিত হয়ে গেল পুরো জনগোষ্ঠী। আবেগ আর বিস্ময় কাটিয়ে যখন সবাই জেগে উঠল, দেখল আ স ম আবদুর রবের সাহসী দৃঢ় হাতে সেই পতাকা তখনো পতপত করে উড়ছে। আর আকাশ-বাতাস কম্পিত করে চারদিকে শুধু স্লোগান-‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। সেই দৃশ্য, সেই অনুভূতি, সেই শিহরন কোনোদিন ভুলার নয়! ২ মার্চের পর এ পতাকা হয়ে গেল বাংলাদেশের স্বাধীনতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। কয়দিনের মধ্যেই বাড়িতে বাড়িতে উড়তে শুরু করল বাংলাদেশের পতাকা।

৩ মার্চ ৩২নং রোডে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাতে ছাত্র-জনতা তুলে দিল সেই পতাকা। এর মাঝেই শুরু হয় ঢাকায় ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোচনা। আলোচনায় কোনো অগ্রগতি ছিল না। লোকদেখানো ঢঙে আলোচনা চালালেও ভেতরে ভেতরে জল্লাদ ইয়াহিয়া খান জুলফিকার আলী ভুট্টোর যোগসাজশে ইতিহাসের এক জঘন্যতম গণহত্যার নীলনকশা প্রণয়ন করেছিল।

২৩ মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তৎকালীন গভর্নর হাউজে শেষবারের মতো গেলেন ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে কথা বলতে। সেদিন বঙ্গবন্ধুর গাড়ির সামনে টানানো ছিল বাংলাদেশের পতাকা।

সেদিন ইয়াহিয়া খান বৈঠকে এলো না। তার আমলারা জানাল, ইয়াহিয়া খান ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন জেনারেলদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। ইতিহাসবেত্তাদের ধারণা, পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনী যখন জানল বঙ্গবন্ধু গাড়ির সামনে বাংলাদেশি পতাকা নিয়ে গভর্নর হাউজে আসছেন, তখন ইয়াহিয়া খান তার গাড়িবহরকে ঘুরিয়ে সোজা ক্যান্টনমেন্টে যেতে বলল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রতিটি ধাপে এ পতাকা এক অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের বন্দুকের ডগায়, অগ্রগামী মুক্তিসেনাদের অস্থায়ী ঘাঁটির খুঁটিতে বাঁশের ডগায়, কচুরির ফণায়, নৌকার বৈঠায়-সর্বত্রই ছিল এর সগর্ব উপস্থিতি।

কিন্তু কোত্থেকে এলো এ পতাকা, কে করেছে এর নকশা? ২ মার্চ কে দিয়েছিল আ স ম আবদুর রবের হাতে এই পতাকা? এ নিয়ে খুব একটা তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ হয়নি। ’৭১-এর ঘটনাবলির অনেক সত্যই সময়ের চিরন্তন নিয়মে স্মৃতির আড়ালে চলে যাচ্ছে। এ সুযোগে প্রচার পাচ্ছে বাংলাদেশের পতাকার উৎপত্তি সম্বন্ধে অনেক কল্পকাহিনি।

স্বাধীন বাংলার এ পতাকার জন্মকাহিনি যিনি আমাকে বলেছিলেন, তিনি আজ নেই আমাদের মাঝে। আমাদের বন্ধু হিলালুর রহমান চিশতী, স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রথম শহিদ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল চিশতীকে তৎকালীন ইকবাল হলের (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) সেই রুমেই যেখানে জন্ম হয়েছিল স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকার।

২ মার্চের পতাকা উত্তোলনের সভায় আমি ও চিশতী পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিলাম। অগ্নিদীপ্ত আমার সেই বন্ধুটি আমাকে বলে গেল অজানা দু-চারটা কথা, এই পতাকাকে নিয়ে। হিলালুর রহমান চিশতীর রুমেই জন্ম হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার। স্বাধীনতাযুদ্ধের অনেক ছোট-বড় ঘটনার সাক্ষী এ সার্জেন্ট জহুরুল হক।

১৯৭০ সালের জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাস। সামনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন। মনিরুল হক চৌধুরী তখন ঢাকা শহর ছাত্রলীগের সভাপতি। মনিরুল হক চৌধুরী (বর্তমানে বিএনপি নেতা) কুমিল্লা থেকে একজন তরুণ শিল্পী নিয়ে এলেন নির্বাচনপূর্ব পোস্টার লেখার জন্য। শিল্পীর নাম শিব নারায়ণ দাস। নিজেই ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র। শিব নারায়ণ প্রথম সপ্তাহ মহসীন হলে থাকলেন। শিব নারায়ণ ছিলেন শৈল্পিক সত্তায় ভরপুর এক কর্মপাগল মানুষ। মহসীন হলে এক সপ্তাহ কাজ করার পর নারায়ণকে নেওয়া হয় তৎকালীন ইকবাল হলে চিশতীর রুমে। সেখানে বসেই তিনি এঁকেছিলেন সত্তরের নির্বাচনের জন্য অসংখ্য পোস্টার। পোস্টার আঁকার ফাঁকে ফাঁকে চলত রাজনীতির আড্ডা।

একসময় শিব নারায়ণ একটা গাঢ় সবুজ পোস্টার বোর্ড ফ্লোরে ফেলে এর মাঝে একটা ঝলমলে লাল বৃত্ত এঁকে বললেন, এটাই আমাদের পতাকা, স্বাধীন বাংলার পতাকা। উপস্থিত সবাই উজ্জীবিত হলো। কচুরি সবুজের মাঝে রক্তলাল সূর্যের আভা অপূর্ব লাগছিল।

চিশতী একটা তুলিতে হলুদ রং মাখিয়ে বৃত্তের মাঝে এঁকে ফেলল পূর্ব বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) মানচিত্র। বলল, ‘এই আমাদের দেশ’। অন্য অনেক মহড়ার মতো, বাংলাদেশের পতাকার মহড়াও সেখানে শেষ হলো, তখনকার মতো। সেই পতাকার পোস্টারটা স্থান করে নিল চিশতীর রুমে টানানো অনেক পোস্টারের সঙ্গে।

১ মার্চ যখন সিদ্ধান্ত হলো স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হবে; চিশতী বের করে আনল শিব নারায়ণের আঁকা পতাকাটা, দিয়ে দেয় অ স ম আবদুর রবের হাতে। কে এটা দর্জির কাছে নিয়েছিল, ঠিক কোথায় সেলাই হয়েছিল, চিশতী সেটা বলেনি।

আ স ম আবদুর রব এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘এর কাপড় কেনা হয়েছিল ঢাকা খদ্দর মার্কেট থেকে এবং এটা সেলাই হয়েছিল বলাকা বিল্ডিংয়ে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় অফিসের পাশের এক দরজির দোকানে।’ তিনি আরও বলেছেন, এটা সেলাই করার আগে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের নেতারা এটাকে অনুমোদন দিয়েছিলেন, আ স ম আবদুর রবের রুমে বসে। তার সাক্ষাৎকারে আ স ম আবদুর রব কিছু ঘটনা কিছুটা অন্যভাবে স্মরণ করেছেন।

তবে এ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, শিব নারায়ণ দাসই বাংলাদেশের পতাকার মূল নকশাকার। বিভিন্ন সময় তিনি যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, সেখানেও কিছু ঘটনা অন্যভাবে স্মরণ করেছেন। আমি এখানে শুধু উল্লেখ করেছি হিলালুর রহমান চিশতী তার মৃত্যুর তেইশ দিন আগে যে কথাগুলো আমাকে বলে গিয়েছিল। অর্ধশতাব্দী পরও আমি চিশতীর একটা শব্দও ভুলিনি। হয়তো এটা পতাকা আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। তবে এ কথাগুলো না লিখে গেলে স্বাধীনতার প্রথম শহিদের প্রতি অবিচার হবে। আমাদের দেশে মৃত সৈনিকের জন্য স্বীকৃতি পাওয়া কঠিন, যারা জীবিত তারাই শুধু স্বীকৃতি খোঁজেন এবং পেয়ে থাকেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিল পতাকা থেকে মানচিত্র সরিয়ে ফেলা হবে। মানচিত্র পতাকায় আঁকা খুব সহজ ব্যাপার নয়, হরদম পতাকার মানচিত্র বিকৃত হচ্ছিল। শিল্পী কামরুল হাসান নতুন ডিজাইনে মানচিত্র সরিয়ে পতাকার রং ও পরিসীমা নির্ধারণ করলেন এবং তা সরকারিভাবে নথিবন্ধ করলেন।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের পরিণতি

মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের পরিণতি

একটি জাতির জন্ম

একটি জাতির জন্ম

স্বাধীনতা আর উপনিবেশায়ন

স্বাধীনতা আর উপনিবেশায়ন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম