যুগান্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি সেনা কর্মকর্তা
ইয়াবা-সংশ্লিষ্টতায় বিজিবি কক্সবাজারের সাবেক কমান্ডিং অফিসারের বিচার শুরু * বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে এক সাক্ষী গুম, বাকিদের খুন-গুমের হুমকি
Advertisement
জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটি সংবাদ প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে সামরিক আদালতে (কোর্ট মার্শাল) কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির সাবেক কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল ফারুক হোসেন খানের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। রামু ক্যান্টনমেন্টে এই বিচার চলছে। যুগান্তরে ইয়াবা-সংশ্লিষ্টতা ও দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এই বিচার শুরু হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্ট বিবেচনায় নিয়ে এমন বিচার এটাই প্রথম বলে জানা যায়। গত ২৫ এপ্রিল যুগান্তরের প্রথম পাতায় ‘কক্সবাজারে বিজিবি সিও’র ইয়াবা ভাগাভাগি’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে লে. কর্নেল ফারুক খানের ইয়াবা চোরাচালান ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থাকার বিস্তর তথ্য প্রকাশিত হয়।
সেনা সূত্র জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে রামু ক্যান্টনমেন্টে শুরু হয়েছে এই বিশেষ কোর্ট মার্শাল। বিচারক হিসাবে চারজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার সেনা কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিচার কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকা কক্সবাজার বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ।
সেনা সূত্র নিশ্চিত করেছে, যুগান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর ৩৪ বিজিবির সাবেক কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল ফারুক হোসেন খানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে বিজিবি। তদন্তে কিছু অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সেনা আইনে বিচার করতে কোর্ট মার্শালের আদেশ হয়। এর আগে প্রাথমিক তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমের সাক্ষীদের জেরা সম্পাদন করেছেন কক্সবাজার রিজিয়নের বিজিবি ইন্টেলিজেন্স পরিচালক লে. কর্নেল মাহবুবুর রহমান।
সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছেন, বিভিন্ন সময়ে সেনা আইনে কোর্ট মার্শাল হয়েছে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও নানা অপকর্মের কারণে। কিন্তু সেনা ইতিহাসে এই প্রথমবার গণমাধ্যমে কোনো সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে সেনা আইনে কোর্ট মার্শাল হচ্ছে।
সূত্র জানায়, এ কোর্টে ৪০ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেবেন। এর মধ্যে রয়েছেন সাধারণ মানুষ, বিজিবি সদস্য ও সাংবাদিকরা। যুগান্তরের প্রতিবেদককেও অন্যতম সাক্ষী করা হয়েছে মামলায়।
এক সাক্ষী গুম, বাকিদের খুন-গুমের হুমকি : এদিকে অভিযোগ উঠেছে, অভিযুক্ত লে. কর্নেল ফারুক বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে সাক্ষীদের গুম ও খুনের হুমকি দিচ্ছেন ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে। এমনকি রাষ্ট্রপতির নাম ব্যবহার করে বিচার কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করারও চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া বিএনপি নেতাদের মাধ্যমে কয়েকজন সাক্ষী ও প্রতিবেদকের কাছে ফোন করে সাক্ষ্য না দিতে বলা হয়েছে। শুধু অনুরোধই নয়, সাক্ষীদের কোটি টাকা ঘুস ও বিদেশে পাঠানোর প্রলোভনও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকে প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, এ কারণে তারা চরম ভয়ের মধ্যে রয়েছেন।
অন্যতম সাক্ষী ইলিয়াস গুম নাকি আত্মগোপনে? মামলার অন্যতম সাক্ষী, ‘ইয়াবা গডফাদার’খ্যাত ইলিয়াস ওরফে ইলিয়াস মাঝি ১০ সেপ্টেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তার বড় ভাই আবদুর রশিদ উখিয়া থানায় এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেছেন। আবদুর রশিদ জানান, ইলিয়াস আগে ইটভাটা থেকে চাঁদা আদায়ের বিষয়ে প্রাথমিক তদন্তে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। কোর্ট মার্শালে সাক্ষ্য দেওয়ার কথা থাকায় বিজিবি তাকে সুরক্ষায় রেখেছিল। কিন্তু মায়ের অনুরোধে কয়েক দিনের জন্য বাড়িতে ফেরেন ইলিয়াস। এরপর ১০ সেপ্টেম্বর বিকাল ৪টার দিকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের মাঝিরঘাট এলাকা থেকে তিনি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন।
আবদুর রশিদের দাবি, ‘নানান চাপ দিয়ে যখন সাক্ষ্য দেওয়া থেকে বিরত রাখা যাচ্ছিল না, তখন কোর্ট মার্শালে যেন সাক্ষ্য দিতে না পারে, সে জন্যই আমার ভাইকে লে. কর্নেল ফারুক খান গুম করেছে বলে আমরা মনে করি।’ তিনি আরও বলেন, ইলিয়াস নিজে আত্মগোপনে যাওয়ার মানুষ নন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মামলার কয়েকজন সাক্ষী যুগান্তরকে বলেন, তাদেরও বিএনপি নেতাদের মাধ্যমে সাক্ষ্য না দিতে তদবির করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেওয়া হয়েছে ভয়ভীতি, ঘুসের প্রস্তাব এবং বিদেশ পাঠানোর অফার। তারা বলেন, এখন আমরা খুব ভয়ে আছি।
শুধু সাক্ষীরা নন, যুগান্তরের প্রতিবেদককেও সাক্ষ্য না দিতে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। অভিযুক্ত লে. কর্নেল ফারুক খান রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে সাংবাদিককে সাক্ষ্য থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সাক্ষীদের হুমকি-ধমকির বিষয়টি অবগত করা হয়েছে কক্সবাজার বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ এবং গোয়েন্দা দায়িত্বে থাকা লে. কর্নেল মাহবুবুর রহমানকে। তারা সাক্ষী ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে লে. কর্নেল ফারুক হোসেন খানের ব্যবহৃত ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
