কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে সব তথ্য
বৈদেশিক খাতে গুপ্ত ঋণ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা নিরসনের পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বর্তমানে এসব খাতে সমুদয় ঋণের তথ্য যেমন সরকারি কোনো সংস্থার কাছে নেই, তেমনই কোনো ঋণ খেলাপি হলে সে তথ্যও থাকে না। ফলে বৈদেশিক ঋণে খেলাপি হয়েও দেশে বা বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণ করতে পারছে। ঋণ পরিশোধের জন্য যখন দাতা সংস্থা থেকে প্রবল চাপ আসে, তখনই কেবল এটি জানাজানি হয়। তখন ঋণ পরিশোধে জরুরি ভিত্তিতে ডলার সংগ্রহ করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ বেড়ে যায়। এতে ডলার বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ আড়াই বছরে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঋণকে ব্যাংকাররা গুপ্ত বৈদেশিক ঋণ হিসাবে অভিহিত করেছেন। এসব ঋণে বিশৃঙ্খলা রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) বেসরকারি খাতের সব ধরনের বৈদেশিক ঋণের তথ্য জানাতে হবে। কীভাবে জানাতে হবে, সে বিষয়ে একটি ফরম্যাটও দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই ফরম্যাট অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক ঋণের তথ্য জানালে গুপ্ত বৈদেশিক ঋণের তথ্য প্রকাশিত হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি সার্কুলার জারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ নির্দেশনা ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হবে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত সব বৈদেশিক ঋণের তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দিষ্ট ফরম অনুযায়ী পাঠাতে হবে। বিডা বা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের আবশ্যকতা নেই-এমন বৈদেশিক ঋণের তথ্যও এখন থেকে সিআইবিতে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি যেসব ঋণের কোনো অনুমোদনই নেই, সেগুলোর তথ্যও পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ, ঋণ গ্রহণের তারিখ, মেয়াদ, পরিশোধ পদ্ধতি, ঋণের স্থিতি-এসব তথ্য দিতে হবে। পাশাপাশি কোনো ঋণ খেলাপি হয়েছে কি না, মেয়াদোত্তীর্ণ কি না-এসব তথ্যও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচালকদের নাম এবং যেসব ব্যক্তির ২০ শতাংশের বেশি শেয়ার বা জামিনদাতা রয়েছেন, তাদের নামও পাঠাতে হবে। ঋণগ্রহীতার পাশাপাশি বিদেশি ঋণদাতার নাম, ঠিকানা, দেশের নামও পাঠাতে হবে। ঋণ গ্রহণের বৈদেশিক মুদ্রায় তথ্য পাঠানোর পাশাপাশি ডলারেও এর তথ্য দিতে হবে। কোনো ঋণের সার্বিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে তা সঙ্গে সঙ্গে সিআইবিকে জানাতে হবে। ১ নভেম্বর থেকে সিআইবিকে এসব তথ্য জানাতে হবে।
সার্কুলারে বলা হয়, দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর বিতরণ করা সব ঋণের তথ্য সিআইবিতে থাকে। ঋণ খেলাপি হলে সে তথ্যও থাকে। আইন অনুযায়ী ঋণখেলাপিরা নতুন ঋণ নিতে পারেন না। কিন্তু সিআইবিতে দেশের বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের সঠিক কোনো তথ্য নেই। এমনকি সরকারি কোনো সংস্থার কাছেও এসব ঋণের তথ্য নেই। এসব তথ্য না থাকায় কোনো ঋণগ্রহীতা খেলাপি হয়ে পড়লেও তাকে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। ফলে তিনি দেশ বা বিদেশ থেকে অবাধে বৈদেশিক ঋণ নিতে পারছেন। পাশাপাশি এসব তথ্য না থাকার কারণে ঋণ পরিশোধের বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের তথ্য নিয়ে সিআইবিতে একটি ডেটাবেজ গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে বৈদেশিক ঋণ খাতে স্বচ্ছতা বাড়বে। ঝুঁকি কমবে। সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাতে ঋণশৃঙ্খলায় সহায়ক হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক ঋণ ১১ হাজার ৩২০ কোটি ডলার। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ ২ হাজার কোটি ডলার। সরকারি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণ গ্রহণে অনেক ক্ষেত্রে কোনো অনুমোদন নেওয়া হয় না। সেগুলোর তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকও জানে না। পরিশোধের সময় এসব গুপ্ত ঋণ এখন বেরিয়ে আসছে।
অপর এক সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে থাকা নন-লিস্টেড সিকিউরিটিজগুলোর তালিকাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআইবিতে পাঠাতে হবে। কারণ, এগুলোকেও ঋণ হিসাবে বিবেচিত করতে হবে।
