Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ের কবি

অযত্নে সিকানদার আবু জাফরের বাড়ি

Advertisement

Icon

মো. মুজাহিদুল ইসলাম, সাতক্ষীরা

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অযত্নে সিকানদার আবু জাফরের বাড়ি

সিকানদার আবু জাফর।

Advertisement

বিক্ষোভ-বিদ্রোহ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় আত্মবিশ্বাসী কবি কখনো প্রত্যক্ষ উচ্চারণে, কখনো রূপকের অন্তরালে আক্রমণ করেছেন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশবাসীকে স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও বিপ্লবের চেতনায় উজ্জীবিত করতে তিনি রচনা করেছেন অসংখ্য গান ও সাহিত্য। একজন শব্দসচেতন, সমাজসচেতন সংগ্রামী কবি সিকানদার আবু জাফর। বক্তব্যে স্পষ্টভাষী আর মেজাজে বলিষ্ঠ হওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন তিনি। কোনো নির্দিষ্ট গতিতে বা ছকে বাঁধা পড়ে থাকেননি। তিনি তার কাব্যের মূল সুর খুঁজেছেন সমাজ সংঘাতের দুঃখবেদনার মধ্যে। তার সময়ের অন্যায়কে প্রকাশ করেছেন কবিতায়।

কবির বাড়িটি পড়ে আছে অযত্ন আর অবহেলায়, কয়েকটি ঘর ছাউনিবিহীন পড়ে আছে, বাড়ির আঙিনায় দর্শনার্থীদের জন্য নেই কোনো টয়লেট বা বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা। নেই কোনো বিশ্রামাগার। কবির লেখা সব বই নেই তার নিজ বাড়ি কিংবা পরিবারের কাছে।

সিকানদার আবু জাফরের গল্প, উপন্যাস এবং প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সম্পাদকীয় সর্বত্রই বাংলাদেশ ও তার শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তি, মানবতার জয়গান হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী এবং আন্তর্জাতিকতাবাদী। তাই সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের সপক্ষে সোচ্চার ছিল তার ক্ষুরধার কলম। তার সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা সমকালের সম্পাদকীয় নিবন্ধেও একজন প্রগতিশীল মানবতাবাদী লেখকের কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়। এই পত্রিকায় প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি নিজ জাতিসত্তার অনুকূলে লিখিত গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন অসম সাহসিকতায়।

সাম্প্রদায়িকতা, দুর্ভিক্ষ, গণতন্ত্রহীনতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে শুরু থেকে শেষ অবধি সোচ্চার ছিলেন সিকানদার আবু জাফর। নাগরিক অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সব সময় তিনি ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা। তার মতো অসাধারণ কবি, গীতিকার, সম্পাদক এবং অনন্য মানবতাবাদী ব্যক্তিত্বের অভাব আজ বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে।

কবি সিকানদার আবু জাফর ১৯১৯ সালের ১৯ মার্চ সাতক্ষীরা জেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের হাশেমী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্ণ নাম সৈয়দ আল্ হাশেমী আবু জাফর মুহম্মদ বখ্ত সিকানদার। তাদের আদি নিবাস ছিল পাকিস্তানের পেশোয়ারে। সেখান থেকে তার পিতামহ মাওলানা সৈয়দ আলম শাহ হাশেমী ওই গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। তিনি পেশাগত জীবন শুরু করেন এবং পরে সিভিল সাপ্লাই অফিসে চাকরি করেন। সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের ‘গ্লোব নিউজ এজেন্সি’ নামক সংবাদ সংস্থায়ও তিনি কাজ করেন। এ সময় তিনি ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।

আবু জাফর ১৯৫০ সালে কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন এবং বিভিন্ন সময়ে দৈনিক নবযুগ, ইত্তেফাক, সংবাদ ও মিল্লাত পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। একজন সাহিত্যিক হিসাবে সিকানদার আবু জাফরের যে খ্যাতি তার চেয়েও অনেক বেশি প্রসিদ্ধি সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি সাহিত্য পত্রিকা ‘সমকাল’র প্রকাশক ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে পূর্ববঙ্গের সাহিত্য আন্দোলনে নতুন গতির সঞ্চার করেছিলেন।

সিকানদার আবু জাফরের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ-কাব্যগ্রন্থ : ‘প্রসন্ন প্রহর’, ‘বৈরী বৃষ্টিতে’, ‘তিমিরাত্মিক’, ‘বৃশ্চিক লগ্ন’ ‘বাংলা ছাড়ো’; নাটক : ‘সিরাজউদ্দৌলা’, ‘মহাকবি আলাওল’, ‘মাকড়সা’; উপন্যাস : ‘মাটি আর অশ্রু’, ‘পূরবী’, ‘নতুন সকাল’; কিশোর উপন্যাস : ‘জয়ের পথে’, ‘নবী কাহিনী’; অনুবাদ : ‘রুবাইয়াৎ ওমর খৈয়াম’, ‘সেন্ট লুইয়ের সেতু’, ‘যাদুর কলস’; গান : ‘মালব কৌশিক’ প্রভৃতি। তার রচিত ‘আমাদের সংগ্রাম চলবেই’ গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময় জনগণকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি নাটকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৬) এবং একুশে পদক (১৯৮৪, মরণোত্তর), ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। ১৯৭৫ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় তার মৃত্যু হয় এবং বনানী কবরস্থানে তিনি সমাহিত হন।

পুরো এলাকার ভেতর হাশেমী বাড়িটা ব্যতিক্রম। ৪৬ বিঘা জমির ওপরে পুরোনো আমলের পৈতৃক ভিটার পাশাপাশি বর্তমানে সেখানে কবি পরিবারের নতুন ভবনও হয়েছে। বিশাল আকারের পৈতৃক ভিটাতে মাত্র কয়েকটা পরিবারের বসতি আছে। জন্মভিটা দেখিয়ে কবির ভাইপো সৈয়দ জুনায়েদ আকবর বললেন, এই আম বাগানে কবির অনেক স্মৃতি রয়েছে। গাছের গোড়ায় আপনমনে বসে লিখতেন-পড়তেন। তার স্মৃতির কথা মাথায় রেখে ঠিক আম বাগানের পাশেই ২০১১ সালে করা হয়েছে সিকানদার আবু জাফর ফাউন্ডেশনের দোতলা ভবন। কবি সিকানদার একাডেমি ও পাঠাগারও এই ভবনে। শতবর্ষী পাচিল পেরিয়ে মূল ভিটায় ঢুকে পড়ি। পেছনে রেখে এলাম কবির স্মৃতিবিজড়িত শান বাঁধানো পুকুর ও তার পূর্বপুরুষদের কবর। প্রশস্ত উঠানের এক কোণে আমগাছ। ঠিক এর পাশে একটি চৌচালা ঘর ছিল। সেখানেই জন্মান কবি। ঘরটি এখন নেই। উঠানের অন্য পাশে পাকা বাড়ি উঠে গেলে কবির জায়গা হয় দোতলার কোণার ঘরে। ছাত্রজীবনের পুরোটা কেটেছে সেখানেই।

কবি সিকানদার আবু জাফর ফাউন্ডেশনের পরিচালক কবির ভাইপো সৈয়দ জুলফিকার আকবর বলেন-কবির জন্ম মাস উপলক্ষ্যে অত্র ফাউন্ডেশন ২০১১ সাল থেকে প্রতিবছর ১০ দিনব্যাপী লোকজ মেলার আয়োজন করে আসছে। ‘সিকানদার মেলা’ নামে পরিচিত এ মেলা এখন সরকারিভাবে পালিত হয়। গ্রামীণ ঐতিহ্য, হস্তশিল্প ও লোক সংস্কৃতিকে এগিয়ে ফাউন্ডেশন কাজ করে চলেছে বলে জানান তিনি।

কবির প্রতি সম্মান রেখে ও কবির স্মৃতি অম্লান করার লক্ষ্যে কবির পরিবার ও এলাকাবাসী মিলে কবির বাড়ির সামনে তেঁতুলিয়াতে ২০০১ সালে গড়ে তুলেছেন কবি সিকানদার আবু জাফর মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়টিতে তেঁতুলিয়া গ্রাম ছাড়া আশপাশের আরও ১০-১২টি গ্রামের ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করছে।

কবির ভাইপো জুনায়েদ আকবর বলেন, কবির বাড়িটি নিয়ে বিভিন্ন সময় সরকারের তরফ থেকে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও বাস্তবে কিছুই হয়নি। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার মধ্য দিয়ে কবির বাড়িটিকে দর্শনীয় স্থান বানানো গেলে ভক্তরা এখানে এসে পরিতৃপ্ত হবেন। কবির পরিচিতির মাধ্যমে পরিচিতি পাবে আমাদের তালা উপজেলা আর সাতক্ষীরা জেলা।

সরেজমিন দেখা যায়, কবির বাড়িটি পড়ে আছে অযত্ন আর অবহেলায়, কয়েকটি ঘর ছাউনিবিহীন পড়ে আছে, বাড়ির আঙিনায় দর্শনার্থীদের জন্য নেই কোনো টয়লেট বা বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা। নেই কোনো বিশ্রামাগার। কবির লেখা সব বই নেই তার নিজ বাড়ি কিংবা পরিবারের কাছে। বাড়ির পাশে কবি সিকানদার আবু জাফরের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য একটি ফাউন্ডেশন নির্মাণ করা হলেও সেটি এখন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সেখানে আসেন না প্রশাসনের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি। সাতক্ষীরার মাটিতে জন্ম নেওয়া এতবড় কবি প্রচারণার অভাবে নিজ জেলাবাসীর কাছেই যেন অচেনা-অজানা।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম