ক্রিকেটারকে যৌন হয়রানি
জাহানারার অভিযোগ পাননি দাবি শফিউলের
Advertisement
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের পেসার ও সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম সম্প্রতি যৌন হয়রানি এবং অনৈতিক প্রস্তাবের অভিযোগ তুলেছেন। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে উত্তাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ক্রিকেটপাড়া। জাহানারার পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ ক্রিকেটার মাশরাফি মুর্তজা, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, তাইজুল ইসলামসহ অনেকেই। তবে এরপরও নারী ক্রিকেটারদের বেশিরভাগই নীরব রয়েছেন। অনেকেই এখনো নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে শঙ্কায় আছেন। তাই মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন। এদিকে জাহানারার অভিযোগ খাতিয়ে দেখতে বিসিবি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
জাহানারা তার বক্তব্যে বলেছেন, বিসিবির নারী উইংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলকে অনেকবার বলেও কাজ হয়নি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকেই তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন। শনিবার হোয়াটসঅ্যাপে যুগান্তরকে শফিউল আলম বলেন, ‘জাহানারা কয়েকবার অভিযোগ করেছেন, কেন তাকে দলে নেওয়া হচ্ছে না-এসব নিয়ে। দলের নিয়ম নিয়ে মঞ্জুরুল কড়াকড়ি ছিলেন, সেটা অনেকেই বলেছেন। কিন্তু আমাকে কখনই আকার, ইঙ্গিত কিংবা সরাসরি জাহানারা বা অন্য কেউই বলেননি যে তাকে হেনন্তা করা হচ্ছে। তাহলে আমি অবশ্যই ব্যবস্থা নিতাম।’ তিনি বলেন, ‘কয়েকটা মিডিয়ায় দেখছি বিভিন্নভাবে আমার নামে উলটা-পালটা ও বানোয়াট বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। আমি এখনো স্পষ্ট করে বলতে চাই-মিডিয়ায় এসব কোনো কথা বলিনি।’ জাহানারা জানিয়েছেন, সিইও নিজামউদ্দিন চৌধুরীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কাজ হয়নি। তাহলে নিজামউদ্দিন কি আপনাকে অভিযোগের কথা বলেননি? এর জবাবে শফিউল বলেন, ‘আমাকে এই ধরনের কিছু বলেননি সিইও। বলেছিলেন সাধারণ অভিযোগের কথা। আর এরকম গুরুতর বিষয়ে আমাকে তো একটা ফরোয়ার্ডিং কিছু দিয়ে একজন সিইও বসে থাকতে পারেন না। সেটাও দেননি। তারও তো দায়িত্ব আছে এই বিষয়ে গুরুত্বর সঙ্গে দেখা। তিনি বিসিবিতে অনেক বড় পদে আছেন। তাকে দেওয়া চিঠিতে কি আছে সেটা দেখলেই বোঝা যাবে।’ তবে অনেকেরই অভিযোগের তীর এখন সিইও’র কার্যক্রম নিয়ে। ধারণা করা হচ্ছে তিনি এতবড় বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। এ বিষয়ে কাল যোগাযোগ করেও সিইও’র কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে কাল রাত ১১টার পর বিসিবি সংবাদ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, তদন্ত কমিটির নাম। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নারী জাতীয় ক্রিকেট দলের (টিম ম্যানেজমেন্টের) কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অসদাচরণের অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান হলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগের (সাবেক) বিচারপতি তারিক উল হাকিম, অন্য দুই সদস্য হলেন বিসিবির একমাত্র নারী পরিচালক রুবাবা দৌলা ও বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সমিতির সভাপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা। ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন শেষ করার কথা জানিয়েছে বিসিবি। জাহানারা আলম সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেন, নিউজিল্যান্ডে ২০২২ নারী বিশ্বকাপ চলাকালে জাতীয় দলের তৎকালীন নির্বাচক ও ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলাম তাকে অনৈতিক প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে নারী ক্রিকেটের সাবেক ইনচার্জ প্রয়াত তৌহিদ মাহমুদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন জাহানারা। এমনকি বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন চৌধুরীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো কাজ হয়নি। তবে এ বিষয়ে বাকি নারী ক্রিকেটাররা কেউই মুখ খুলছেন না। একমাত্র সাবেক অধিনায়ক রুমানা আহমেদ এগিয়ে এসেছেন। রুমানাও দীর্ঘদিন ধরে এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছিলেন। রুমানা জানিয়েছেন, মঞ্জুরুল ইসলাম একেকজনের সঙ্গে একেক রকম অন্যায় করেছেন। তিনি বলেন, ‘দলে এমনও কিছু ক্রিকেটার আছেন, যারা এ ধরনের ঘটনায় মন খারাপ করেন, কষ্ট পান এবং সিনিয়র আপুদের সঙ্গে শেয়ার করলেও ক্যারিয়ারের কথা মাথায় রেখে বিষয়টি চেপে যান। জাহানারা প্রথমদিন অভিযোগ করার পরই বোর্ড কোনো তদন্ত না করেই একটা পালটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দেয়। তাহলে বোর্ডের ওপর কীভাবে আস্থা রাখবেন? জাহানারা সিনিয়র এবং এই অবস্থায় গেছেন বলে আজ মুখ খুলতে পেরেছেন। কিন্তু একজন জুনিয়র বা অন্যরা কেউই এসব বলতে পারবে না।’ জাহানারার সমসাময়িক ক্রিকেটারদের অধিকাংশের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সালমা খাতুন বর্তমান জাতীয় দলের নির্বাচক হওয়ায় তার কথা বলাই মানা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সিনিয়র ক্রিকেটার বলেন, ‘কখনই সাহস নিয়ে কিছু বলার মতো সুযোগ ছিল না। কোনো অভিযোগ তুললেই সেটা আস্তে করে ধামাচাপা দেওয়া হতো। বোর্ড আমাদের জন্য এমন কোনো পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি যে সৎ সাহস নিয়ে সত্য কথাটা বলব।’ অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মঞ্জুরুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, ‘বিসিবির তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে, এটা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। এর আগে আমি এ বিষয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকছি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রকৃত সত্য সবার সামনে আসবে আশা করছি। সে সময় পর্যন্ত অনুমানবশত কোনো তথ্য প্রকাশ না করার জন্য সবার কাছে বিনীত অনুরোধ করছি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের পর আমি সবার সঙ্গে কথা বলব।’
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের শুরুর দিক থেকে জাতীয় দলের হয়ে লড়াই করে যাওয়া জাহানারা আলম দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল পেসার। এখন তিনি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ক্লাব ক্রিকেট খেলছেন এবং কোচিং কোর্স করছেন। সবশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। দেশের হয়ে খেলেছেন ৫২ ওয়ানডে ও ৮৩ টি ২০ ম্যাচ, নিয়েছেন ৯৫ আন্তর্জাতিক উইকেট। বিদেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলা বাংলাদেশের একমাত্র নারী ক্রিকেটারও তিনি।
এদিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, জাহানারা আলমের অভিযোগের ভিত্তিতে নারী বিভাগের তিন কর্মকর্তা, এক কোচসহ চারজনকে ওএসডি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি।
