আওয়ামী লীগ সরকারের বৈদেশিক ঋণ
পরিশোধ বেড়েছে ১২ গুণ, ঋণ বেড়েছে ৪ গুণ
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিচার-বিশ্লেষণ না করে মাত্রাতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়। এখন ওইসব ঋণ সুদসহ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে ঋণের সুদের হার বাড়ার কারণে সুদ পরিশোধের চাপও বেড়েছে। গত ১৪ বছরে দেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। একই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ৬ গুণ। এছাড়া ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়েছে ১২ গুণের বেশি।
রোববার বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবছর বিশ্বব্যাংক এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক ঋণের সার্বিক তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়। এবারের প্রতিবেদনে ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের তথ্য তুলে ধরা হয়।
সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। এরপর ২০১০ সাল থেকেই তাদের সরকার ব্যাপকভাবে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া শুরু করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সরকার ক্ষমতায় ছিল। ৮ আগস্ট নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও তারা শুরুর দিকে বেশি ঋণ নেয়নি। ফলে ওই সময়ের প্রায় পুরো ঋণই আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া। তবে ওই বছরের বাকি ৪ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ থেকে স্বল্প সুদে সামান্য কিছু ঋণ গ্রহণ করে।
সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংক আগে বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে নিম্ন ক্যাটাগরির দেশ হিসাবে বিবেচনা করত। অর্থাৎ ঝুঁকির প্রবণতা ছিল একেবারে কম। কিন্তু বর্তমানে তা নেমে এসে এখন মাঝারি ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে। এর ফলে ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়েছে।
এদিকে আইএমএফ আগে বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কোনো ঝুঁকিতে ফেলত না। এখন সংস্থাটি বাংলাদেশকে নিম্ন ঝুঁকিতে ফেলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ২ হাজার ৬৫৭ কোটি ডলার। গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৪৪৯ কোটি ডলারে। আলোচ্য ১৪ বছরে দেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। ২০১০ সালে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ছিল ২ হাজার ২২২ কোটি ডলার। গত বছরে এর স্থিতি বেড়ে ৮ হাজার ৬৮৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য সময়ে এ খাতের ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। এসব ঋণের বেশির ভাগই নেওয়া হয়েছে সরকারি খাতের বড় বড় প্রকল্পে। এর মধ্যে বেশকিছু বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। বাকি আরও কিছু ঋণের কিস্তি পরিশোধ অচিরেই শুরু হবে। ফলে দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে চাপ আরও বাড়বে। ২০১০ সালে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয় ৮২ কোটি ডলার। গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯০ কোটি ডলারে। আলোচ্য সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ৬ গুণ। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়েছে ১২ গুণের বেশি। ২০১০ সালে সুদ পরিশোধ করা হয় ২০ কোটি ডলার। গত বছর পরিশোধ করতে হয়েছে ২৪৪ কোটি ডলার। ঋণের সুদের হার বাড়ায় এ খাতে পরিশোধও বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত।
আলোচ্য ১৪ বছরে স্বল্পমেয়াদি ঋণও বাড়ে ব্যাপকভাবে। ২০১০ সালে এ ঋণের স্থিতি ছিল ২৯৫ কোটি ডলার। গত বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৯৫ কোটি ডলার। এ খাতে ঋণ বেড়েছে সাড়ে ৪ গুণ। স্বল্পমেয়াদি ঋণ ৩ থেকে ৬ মাস মেয়াদে নেওয়া হয় বলে এসব ঋণের বড় অংশই ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। এ খাতে সুদের হার আরও বেশি।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বিগত সরকার মোট বৈদেশিক ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ নেয় সরকারি ও সরকারি খাতের গ্যারান্টিতে। মোট ঋণের মধ্যে ২০১০ সালে এ খাতে ঋণের স্থিতি ছিল ২ হাজার ১১৫ কোটি ডলার। গত বছর তা বেড়ে ৭ হাজার ৭৫৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফলে এসব ঋণের দায় সরকারের কাঁধেই চাপছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ যেসব বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করেছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়েছে বিশ্বব্যাংক থেকে। গত বছর পর্যন্ত মোট ঋণ স্থিতির ২৬ শতাংশ নিয়েছে এ সংস্থাটি থেকে। এর সবই স্বল্প সুদের বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার বা আইডিএর ঋণ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে নিয়েছে ২০ শতাংশ। দেশভিত্তিক ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়েছে জাপান থেকে, যা মোট ঋণের ১৪ শতাংশ, রাশিয়া থেকে ১০ শতাংশ এবং চীন থেকে ৮ শতাংশ।
