এসডিজির অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়: জিইডি’র প্রতিবেদন
লুটেরারা অর্থ পাচার করে বিদেশে বিনিয়োগ করেছে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়ন সন্তোষজনক নয়। কিছু ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকলেও পিছিয়ে আছে বেশির ভাগ সূচকে। এর কারণ হিসাবে বলা হয়, করোনা মহামারি থেকে শুরু করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ অভ্যন্তরীণ অনেক চ্যালেঞ্জের কারণেই এমডিজির মতো ভালো অগ্রগতি সম্ভব হয়নি এসডিজিতে। তবে দেশের অর্থনীতি খুব খারাপ অবস্থা থেকে এখন কিছুটা স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন বৈদেশিক ঋণের ফাঁদ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগে খরা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মন্থর জিডিপি প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হার বৃদ্ধি এবং কম রাজস্ব আদায় ইত্যাদি। সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা ২০২৫ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি’ প্রতিবেদন ২০২৫’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর আয়োজক প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, এসডিজির মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ, অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং পরিকল্পনা সচিব এসএম শাকিল আকতার। জিইডির সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেনের সভাপতিত্বে সেসিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জিইডির অতিরিক্ত সচিব ড. মনিরা বেগম। আলোচক ছিলেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ এবং সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
সেমিনারে জিইডির স্টেট অব ইকোনমির তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, মূল্যস্ফীতি আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও চালের দাম কাঙ্ক্ষিত হারে কমানো যায়নি। এছাড়া পরোক্ষ খাতে বেশির ভাগ কর্মসংস্থান হচ্ছে, যা প্রায় ৮৪ ভাগ। এডিপি বাস্তবায়ন পরিস্থিতি ভালো না, অনেক মন্ত্রণালয় অর্থ ব্যবহার করতে পারেনি। ২০২৫ সালে কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭ ভাগ, যা অনেক কম।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ঋণখেলাপি, মূল্যস্ফীতিসহ সামষ্টিক অর্থনীতির নানাদিক নিয়ে লড়াই করতে হয়েছে সরকারকে। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ ছিল না। বিনিময় হার ঠিক করতে না পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না পুরোপুরি। এছাড়া এই মুহূর্তে সুদের হার কমানো সম্ভব নয়। এটি করলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। বাংলাদেশে এখন এমন ব্যাংকও আছে, যাদের ৯৯ শতাংশ মূলধন খেলাপি হয়ে গেছে এবং এটা আদায় করা সম্ভব না। কোনো ব্যাংকে কোনো ঋণখেলাপি হলে এখন থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারকে দায়ী করা হবে। একীভূত হওয়া ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আগামী সপ্তাহ থেকে টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হবে।
সেমিনারে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, আমরা ইতোমধ্যেই ঋণের ফাঁদে পড়েছি। এ সত্য স্বীকার না করলে সামনে এগোনো সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর আগেও আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশের বেশি ছিল, এখন তা ৭ শতাংশের ঘরে ঘোরাফেরা করছে। সমস্যাটি কোথায়, তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। কর-জিডিপি অনুপাত কমার একটি বড় কারণ হলো, জিডিপির সব খাত থেকে রাজস্ব সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বোঝানো যাচ্ছে না যে, ভ্যাট দেবে জনগণ, আপনারা শুধু এজেন্ট হিসাবে সংগ্রহ করে তা এনবিআরকে দেবেন।
কিন্তু এখানেও অংশ চান ব্যবসায়ীরা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এনবিআর দুই ভাগ হয়ে দুজন সচিবের নেতৃত্বে কাজ শুরু করবে বলে জানান তিনি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে রাজস্ব আদায় বাড়াতে না পারলে বাংলাদেশ গুরুতর ঋণের ফাঁদে পড়ে যেতে পারে। ঋণের ফাঁদে পড়া আমাদের দেশের জন্য ভালো হবে না। তখন ঋণ নিয়ে আবার ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বড় রাজনৈতিক ভূমিকম্প না হলে নির্বাচনের মেট্রো থামবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ইতিবাচক ও নেতিবাচক সূচকের দ্বৈত চাপে আছে। অর্থনীতির সংগ্রাম চলছে, জীবিকার সংগ্রামও চলছে। কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত, সেটা হয়নি। আবার আরও ভালোও হতে পারত, সেটাও হয়নি।
তিনি আরও বলেন, অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক সূচক আছে। যেমন রেমিট্যান্স প্রবাহ নতুন উচ্চতায় উঠেছে, অর্থপাচারে ভাটা পড়েছে, রাজস্ব আদায়ে কিছু গতি এসেছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ মোটামুটি স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের সামাজিক রেজিলিয়েন্স খুব শক্তিশালী, যার বড় উদাহরণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিন দিন যখন রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রায় অকার্যকর ছিল, তখনও অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শফিকুল আলম বলেন, চাকরির সংকট থেকে শুরু করে বিনিয়োগ ও উৎপাদন-সব ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। চট্টগ্রাম বন্দর এফিশিয়েন্ট না হলে বাংলাদেশে নতুন কর্মসংস্থান হবে না। প্রধান উপদেষ্টা এ বিষয়টি নিয়ে বিশ্বের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেছেন। কেননা বন্দরের অদক্ষতার কারণে প্রতিদিন ব্যবসায়ীদের হাজার হাজার ডলারের ক্ষতি হলেও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে যথেষ্ট সমর্থন দিচ্ছেন না।
গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল বার্তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গত ১৬ মাসে আমরা দেখেছি অনেক গণমাধ্যম ও আলোচক অত্যন্ত বেছে নেওয়া ডেটা ব্যবহার করে এমনভাবে উপস্থাপন করছেন, যাতে প্রকৃত পরিস্থিতির বিকৃত চিত্র উঠে আসে। এতে জনগণ ভুল বার্তা পাচ্ছে।
