কর্নেল নাজমুল হুদা হত্যা মামলা
জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততা মেলেনি
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১৯৭৫ সালের নভেম্বরের আলোচিত পালটাপালটি অভ্যুত্থানে কর্নেল নাজমুল হুদা নিহতের ঘটনায় তৎকালীন সেনাপ্রধান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ মেলেনি। হত্যাকাণ্ডের ৪৭ বছর পর করা মামলার তদন্ত শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মেজর (অব.) মো. আবদুল জলিল ও মেজর (অব.) আসাদ উজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এজন্য মামলা থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহেরের (অব.) সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তবে তিনি মারা যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়নি সিআইডি। প্রতিবেদনে সিআইডি বলেছে, হত্যাকাণ্ডটি পালটাপালটি অভ্যুত্থানের জটিল পরিস্থিতিরই ধারাবাহিক অংশ। এজাহারভুক্ত কারও বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ও বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হীন উদ্দেশ্যে সাবেক রাষ্ট্রনায়ক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ অন্যদের নামে মামলাটি করা হয়েছিল। সিআইডির তদন্তেও তা প্রমাণিত হয়েছে। এর আগে হত্যাকাণ্ডের ৪৭ বছর পর ২০২৩ সালের ১০ মে শহীদ কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা বীরবিক্রমসহ তিন সেনা কর্মকর্তা হত্যার অভিযোগে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন নাজমুল হুদার মেয়ে সাবেক সংসদ-সদস্য নাহিদ ইজাহার খান। মামলায় মেজর (অব.) আবদুল জলিলকে প্রধান আসামি এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও জাসদ নেতা লে. কর্নেল আবু তাহেরকে (অব.) হুকুমের আসামি করা হয়েছিল।
মামলার অভিযোগে নাহিদ ইজাহার খান বলেছেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিপথগামী ও বিশৃঙ্খল সদস্যদের হাতে কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা বীরবিক্রম নিহত হন। তিনি তখনকার সেনাবাহিনীর রংপুরের ৭২ ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন। নাজমুল হুদার সঙ্গে অন্য দুই সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল এটিএম হায়দার বীর-উত্তমও নিহত হন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, নাহিদ ইজাহার খানের বাবা নিহত হওয়ার সময় তিনি ও তার ভাই ছোট ছিলেন। তারা বড় হয়ে বাবার কোর্সমেট, সহকর্মী ও বিভিন্ন সূত্র থেকে অনুসন্ধানে জানতে পারেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সকালে দশম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট অফিসে (এখনকার জাতীয় সংসদ ভবনের এমপি হোস্টেল) শহীদ কর্নেল নাজমুল হুদার সঙ্গে অপর দুই সেক্টর কমান্ডারও অবস্থান করছিলেন। নাজমুল হুদা সকালে নাশতা করার সময় দশম ইস্ট বেঙ্গলের কর্মকর্তারা নাজমুল হুদাসহ তিন কর্মকর্তাকে বাইরে নিয়ে যান। তখনকার সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং জাসদ নেতা লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহেরের (অব.) নির্দেশে দশম ইস্ট বেঙ্গলের কর্মকর্তা, জেসিও ও সৈনিকরা সংঘবদ্ধভাবে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটান। এ ঘটনার ৪৭ বছর পর হওয়া মামলা আড়াই বছর পর তদন্ত শেষে গত ৩০ নভেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ইন্সপেক্টর সিকদার মহিতুল আলম।
আদালতে শেরেবাংলা নগর থানার সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা এসআই রফিকুল ইসলাম রাসেল যুগান্তরকে জানান, চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে। পরবর্তী ধার্য তারিখে আদালতে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে।
চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগৃহীত তথ্য, সাক্ষীর জবানবন্দি এবং আর্মি হেডকোয়ার্টার্স ও আর্কাইভস থেকে সংগ্রহ করা নথি পর্যালোচনায় উঠে আসে, ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে খালেদ মোশাররফ তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেন। নাজমুল হুদা তখন রংপুরে ৭২ ব্রিগেডে কমান্ডার ছিলেন। খালেদ মোশাররফ ৪ নভেম্বর তাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ৭ নভেম্বর লে. কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে একদল সেনাসদস্য তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতে পালটা অভ্যুত্থান ঘটায়। ভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টার মধ্যে জাতীয় সংসদ ভবনের এমপি হোস্টেলের মাঠে সেই অভ্যুত্থানের ঘাত-প্রতিঘাতেই কর্নেল হুদা প্রাণ হারান। এজাহারে নাম থাকা মেজর মো. আব্দুল জলিল (অব.), শহীদ জিয়াউর রহমান ও মেজর আসাদউজ্জামানের সম্পৃক্ততার কোনো সাক্ষ্য, তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোনো সাক্ষীও তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। ঘটনাস্থলের কোনো ছবি, ভিডিও বা সুরতহাল প্রতিবেদনও পাওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডটি পালটাপালটি অভ্যুত্থানের জটিল পরিস্থিতিরই ধারাবাহিক অংশ। এজাহারভুক্তদের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, লে. কর্নেল আবু তাহেরের নির্দেশে সেনাবাহিনীর অজ্ঞাতনামা সদস্যরা ও বাম রাজনীতির মদদে কর্নেল নাজমুল হুদাকে হত্যা করা হয়েছে, যা পেনাল কোডের ৩০২/১০৯/৩৪ ধারার অপরাধ সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। পরে সেনা কর্মকর্তা হত্যার দায়ে সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এ কারণে অপরাধ সত্য প্রমাণিত হলেও তিনি মারা যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়নি। তাছাড়া বাদীকে একাধিকবার নোটিশ করলেও বাদী কোনো সাক্ষ্য বা প্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হন। বাদী বর্তমানে পলাতক রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

