নিবন্ধন অধিদপ্তর স্থানান্তরের উদ্যোগ
পালটা যুক্তি দিল রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নিবন্ধন অধিদপ্তরকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর না করার পক্ষে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে বেশকিছু যুক্তি তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআরএসএ) পক্ষ থেকে রোববার লিখিতভাবে এ সংক্রান্ত মতামত আইন মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হয়। বিআরএসএর কয়েকজন সিনিয়র নেতা যুগান্তরকে এ তথ্য জানান।
রেজিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্টকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর করতে গত সপ্তাহে উপদেষ্টা পরিষদে প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত সেটি বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়নি। উপস্থাপনের আগেই এটি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। এরপর দুই মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পর্যায়ে পর্যালোচনা করতে প্রস্তাবটি ফেরত দেওয়া হয়। তবে নিবন্ধন অধিদপ্তর স্থানান্তর করার পক্ষে ভূমি মন্ত্রণালয় যেসব যুক্তি উপস্থাপন করেছে, তা দফাওয়ারি খণ্ডন করেছে বিআরএসএ। এ সংক্রান্ত লিখিত মতামত আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রথম যুক্তি হিসাবে বলা হয়, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করে এক মন্ত্রণালয় হলে জনভোগান্তি কমবে। এর বিপরীতে পালটা যুক্তি দিয়ে বলা হয়, নিবন্ধন ও নামজারি ভিন্ন কর্তৃপক্ষের হাতে থাকলে ‘বিশেষ নিরাপত্তা’ হিসাবে কাজ করবে। একই মন্ত্রণালয়ের হাতে সব ক্ষমতা থাকলে দুর্নীতির সিন্ডিকেট পাকাপোক্তভাবে ভর করবে। ভিন্ন মন্ত্রণালয় থাকলে একে অপরের ভুল ধরতে পারবে এবং এক ধরনের ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা তৈরি হবে।
দ্বিতীয়ত, অটোমেশন, ডিজিটাল ডাটাবেজ ও সমন্বয়ের কাজ করা সহজ হবে। বিআরএসএর পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রযুক্তিগত সমন্বয় বনাম প্রশাসনিক একত্রীকরণ এবং ডাটাবেজ সমন্বয়ের জন্য মন্ত্রণালয় পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। ‘ইন্টার-অপারেবিলিটি’ বা এপিআই ব্যবহারের মাধ্যমে আইন ও ভূমি মন্ত্রণালয় তথ্য শেয়ার করতে পারে। এটি একটি টেকনিক্যাল সমাধান, প্রশাসনিক নয়।
তৃতীয়ত, ভূমি মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর করলে নামজারি-মালিকানা হালনাগাদ দ্রুত হবে। জবাবে বলা হয়, আধা-বিচারিক সত্তা হারানো ভূমি মন্ত্রণালয় মূলত এখন রাজস্ব ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম দেখে। যদিও এ বিষয়ে জনভোগান্তি নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। অথচ নিবন্ধন কার্যক্রমের মূল ভিত্তি হলো টাইটেল ভেরিফিকেশন বা বিচারিক প্রকৃতির। ফলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে গেলে এটি শুধু একটি ‘রাজস্ব আদায়ের কেরানিগিরি’তে পরিণত হবে, যা দলিলের আইনি গুরুত্ব হ্রাস পাবে।
চতুর্থত, বিশ্বব্যাপী প্রচলিত প্রথা-অনেক দেশে ভূমি ও নিবন্ধন একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে। বিআরএসএর পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশীয় প্রেক্ষাপট, সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ এবং মাসদার হোসেন মামলার রায় অনুযায়ী আমাদের বিচারিক ব্যবস্থা স্বতন্ত্র। উন্নত দেশগুলোতে টাইটেল গ্যারান্টি সিস্টেম আছে, যা আমাদের দেশে নেই। সুতরাং যথাযথ আইনি কাঠামো ছাড়া শুধু মন্ত্রণালয় পরিবর্তন বিশৃঙ্খলা বাড়াবে।
পঞ্চম, রাজস্ব আহরণে গতি বাড়বে এবং রাজস্ব আদায় সহজ হবে। এর জবাবে বলা হয়, সরকারের উদ্দেশ্য শুধু রাজস্ব আদায় হওয়া উচিত নয়, বরং নির্ভুল দলিল রেজিস্ট্রি নিশ্চিত করা জরুরি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্য যদি থাকে শুধু রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ, তবে সেক্ষেত্রে অনেক সময় দলিলের আইনি ত্রুটি উপেক্ষা করার ঝুঁকি তৈরি করে।
এছাড়া বিআরএসএর পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, টরেন্স সিস্টেম হলো ভূমি নিবন্ধনের এমন একটি ব্যবস্থা; যেখানে সরকার ভূমির মালিকানার গ্যারান্টি প্রদান করে। ১৮৫৮ সালে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় স্যার রবার্ট টরেন্স এটি প্রথম প্রবর্তন করেন। এই সিস্টেমে জমির মালিকানা কোনো দলিলের (উববফ) ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় না, বরং সরকারের সংরক্ষিত একটি কেন্দ্রীয় রেজিস্টার বা খতিয়ানে যার নাম থাকে, তিনিই চূড়ান্ত মালিক বলে গণ্য হন।
টরেন্স সিস্টেম মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যেমন-সরকারি রেজিস্টার হবে মালিকানার একটি স্বচ্ছ দর্পণ। রেজিস্টারে যা লেখা আছে, জমির বর্তমান অবস্থা ঠিক তা-ই হবে। অর্থাৎ রেজিস্টার দেখলেই বোঝা যাবে মালিক কে এবং এতে কোনো ঋণ বা দায় আছে কিনা। মালিকানা যাচাইয়ের জন্য অতীতের ৫০ বছরের দলিলাদি বা বায়া দলিল খুঁজতে হবে না। যদি সরকারি রেজিস্টারে কোনো ভুল তথ্য থাকে এবং তার কারণে কোনো প্রকৃত মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে সরকার তাকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে।
ভূমি মন্ত্রণালয় যখন নিবন্ধন অধিদপ্তরকে তাদের অধীনে নিতে চায়, তখন তারা এই ‘টরেন্স সিস্টেম’ বা ‘টাইটেল রেজিস্ট্রেশন’ চালুর যুক্তি দেয়। তারা দাবি করেন, দুই দপ্তর এক হলে সরকার মালিকানার গ্যারান্টি দিতে পারবে। অথচ বাস্তবতার নিরিখে টরেন্স সিস্টেম চালুর জন্য মন্ত্রণালয় পরিবর্তন জরুরি নয়, বরং নিবন্ধন আইন এবং রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের আমূল সংস্কার প্রয়োজন। পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা ও নির্ভুল রেকর্ড ছাড়া এই সিস্টেম চালু করলে জালিয়াতি আরও বাড়বে এবং সরকার বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণের দায়ভারের মুখে পড়বে।
এদিকে সাবরেজিস্ট্রারদের অনেকে যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট মামলা পেন্ডিং আছে। এ রিট নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থানান্তর করার উদ্যোগ স্থগিত থাকবে। এছাড়া তারা মনে করেন, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের স্প্রিরিট এবং সাংবিধানিকভাবেও নিবন্ধন অধিদপ্তর আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর করার কোনো সুযোগ নেই।
