জিয়াউর রহমানের কবর সরাতে বাজেট করেন শেখ হাসিনা
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সংসদ ভবনের পাশেই ৭৪ একরজুড়ে বিশাল সবুজ চত্বর। এই চত্বরেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রেশ ধরে এই কবরটি সরাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। ক্ষমতার সাড়ে ১৫ বছরে নানা দফায় তিনি জিয়াউর রহমানের কবর সরাতে উদ্যোগ নেন। এজন্য আশ্রয় নেন কূটকৌশলের। বিখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের নকশা অনুযায়ী সংসদ ভবন এবং এর পুরো এলাকা থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কথা বলেন শেখ হাসিনা। এজন্য প্রায় শতকোটি টাকা ব্যয় করে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মূল নকশার অনুলিপি দেশে আনেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলামনরা ক্ষুব্ধ হবেন-এমন আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের কবর সরানোর সিদ্ধান্ত থেকে তিনি পিছু হটেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিহিংসাপরায়ণ শেখ হাসিনা রীতিনীতি ও সৌজন্যতাবোধের বাইরে গিয়ে সংসদ ভবন এলাকা থেকে জিয়াউর রহমানের কবর সরানোর একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও সফল হতে পারেননি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা আজ দেশছাড়া। আর সেই জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তার স্ত্রী, দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কোটি মানুষ চোখের জলে বেদনাহত চিত্তে বিদায় জানিয়েছেন দেশের অভিভাবককে। সৌম্য ও শান্তির প্রতীক খালেদা জিয়া শেষযাত্রায় যে সম্মান পেয়েছেন, তা ইতিহাসে বিরল।
২০০৮ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে এই কবর সরাতে প্রথম উদ্যোগ নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের ২ জুন সংসদ কমিশনের বৈঠকে তিনি সংসদ ভবন সংরক্ষণে মূল নকশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়-এমন কিছু না রাখার বিষয়ে মত দেন। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলারও পরামর্শ দেন শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে তিনি জিয়াউর রহমানের কবর সরাতে আরও মরিয়া হয়ে ওঠেন। এজন্য অনেকটা চাতুরতার আশ্রয় নেন তিনি। ফুপাতো ভাই ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে দিয়ে একটি প্রস্তাব তোলেন সংসদ অধিবেশনে। প্রস্তাবটি হচ্ছে-‘বিখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের নকশা ফিরিয়ে আনা এবং সংসদ ভবন এলাকা থেকে নকশাবহির্ভূত স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া।’
সেদিন তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সংসদে বলেন, কবর তো বনানী, আজিমপুর বা মিরপুর কবরস্থানে হওয়ার কথা। কবর জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় হবে কেন? তাছাড়া লুই আই কানের নকশার কোথাও শেরেবাংলা নগরে কবরস্থানের জন্য জায়গা নির্ধারিত ছিল না। ২০১৫ সালের ১৬ নভেম্বর জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের তৎকালীন সংসদ-সদস্য অ্যাডভোকেট ফজিলাতুন নেসা বাপ্পির এক প্রশ্নের উত্তরে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, জিয়াউর রহমানের কবর সরিয়ে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সেক্টর কমান্ডারদের জন্য সংরক্ষিত এলাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। এছাড়া সংসদ ভবনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় থাকা জাতীয় কবরস্থানের সাতটি কবরও সরানো হবে। তবে সেখান থেকে সব কবর মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে নেওয়া হবে না। কারও কারও কবর নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে বা কোনো সরকারি কবরস্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে লুই আই কান প্রণীত সংসদ ভবনের মূল নকশা আনা হলেই কবরসহ নকশাবিহীন স্থাপনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর প্রতিবাদ জানিয়ে তখন সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির নেতারা বলেন, লুই আই কানের নকশা আনতে কোটি টাকার মহা আয়োজন করেছে সরকার। মূলত জিয়াউর রহমানের মাজার সরানোর জন্যই এই আয়োজন। এটি কখনো সফল হতে দেওয়া হবে না। বিএনপিসহ দেশের আপামরসাধারণ এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
বিএনপির আপত্তি সত্ত্বেও এ নিয়ে আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংসদ ভবনের মূল নকশা অথবা এর অনুলিপি ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়। একই সিদ্ধান্ত হয় সংসদ কমিশনের বৈঠকেও। একপর্যায়ে বিষয়টি ওঠে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে। ২০১৫ সালের ১৪ অক্টোবর শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেকের বৈঠকে নকশা আনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন বাবদ ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। তৎকালীন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে শেখ হাসিনা যে কোনো মূল্যে নকশা ফিরিয়ে এনে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। এজন্য প্রথম দফায় ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ নেওয়া হয়।
মূলত লুই আই কানের নকশা আনার পেছনে জিয়াউর রহমানের কবর সরানোই ছিল আসল উদ্দেশ্য। একনেকের ওই বৈঠকের পর গণমাধ্যমকর্মীদের এক প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, লুই আই কানের নকশায় সংসদ ভবন এলাকায় কোনো কবরস্থানের জায়গা নেই। তাই আমরা নকশা আনার উদ্যোগ নিয়েছি। নকশা দেখার পর বোঝা যাবে। সেখানে একটি মাজার, না আরও মাজার আছে-বিষয়টি দেখতে হবে। এরপর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শেখ হাসিনার নির্দেশের পর লুই আই কানের প্রতিষ্ঠান ডেভিড অ্যান্ড উইজডমের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে স্থাপত্য অধিদপ্তর। তার নকশাগুলো পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির আর্কিটেকচারাল আর্কাইভে থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে সেখানেও যোগাযোগ করা হয়। এজন্য স্থাপত্য অধিদপ্তর থেকে দুইজন, গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে একজন, গণপূর্ত থেকে একজন এবং সংসদ সচিবালয় থেকে একজনকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল ঠিক করে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ২৯ মার্চ সংসদ কমিশনের বৈঠকে প্রতিনিধি দলটিকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। তৎকালীন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
সূত্র জানায়, ওই বছরেরই মে মাসে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে যান। যাচাই-বাছাই শেষে তারা প্রথম পর্যায়ে জাতীয় সংসদ ভবন এবং এর আশপাশের এলাকার ১১৫টি ‘আনবিল্ড’ নকশা ও ৮৫৩টি নকশার কপি আনার সিদ্ধান্ত নেন। এ বাবদ ব্যয় হয় প্রায় ৭৫ কোটি টাকা। নকশা অনুসন্ধান বাবদ ব্যয় হয় আরও ২০ কোটি টাকা। এছাড়াও কর্মকর্তাদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়াসহ অন্যান্য বাবদ ব্যয় হয় আরও প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে প্রায় শতকোটি টাকার আয়োজন শেষে লুই আই কানের নকশার অনুলিপি দেশে আনা হয় ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর।
পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের আমলে ১৯৬১ সালে বর্তমান সংসদ ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়। সে সময় স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে এই ভবনের স্থপতি নিয়োগ করা হয়। তার প্রস্তাবেই বিখ্যাত স্থপতি লুই আই কান এই প্রকল্পের প্রধান স্থপতি হিসাবে নিয়োগ পান। ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি এ ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। পাকিস্তান আমলে ১৫ মিলিয়ন ডলারের অনুমিত ব্যয় ধরে লুই কানের নকশা অনুযায়ী সংসদ ভবন কমপ্লেক্সটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। পর্যাক্রমে ৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে কমপ্লেক্সটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। স্থপতি লুই কানের নকশায় শেরেবাংলা নগর এলাকায় কবরস্থানের জন্য কোনো জায়গা রাখা হয়নি-এমন যুক্তিতে সেখানকার কবর সরানোর উদ্যোগ নেয় তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছাড়াও সংসদ ভবনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় থাকা জাতীয় কবরস্থানের আরেক সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান ও আতাউর রহমান খান, সাবেক মন্ত্রী মশিউর রহমান যাদু মিয়া, মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ এবং পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার তমিজউদ্দীন খানের কবর রয়েছে। এই আটটি কবর ছাড়াও শেরেবাংলা নগরে আছে লুই কানের নকশাবহির্ভূত আরও সাতটি স্থাপনা। এগুলোর মধ্যে বড় স্থাপনা হচ্ছে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন। এর আগে জাতীয় সংসদ ভবন সীমানার পূর্বপ্রান্তে আসাদগেটের উলটোদিকের পেট্রোলপাম্পটি তুলে দেওয়া হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় তখনকার মন্ত্রী মির্জা আব্বাসের ভাই মির্জা খোকনকে জায়গাটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় সংসদের তৎকালীন চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন পেট্রোলপাম্পটি তুলে দেন এবং নিজের পছন্দের একজনের কাছে ফের ইজারা দেন।
