জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন
সাংগঠনিক দুর্বলতায় ছাত্রদলের পরাজয়
Advertisement
সাকেরুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ভরাডুবির অন্যতম কারণ সাংগঠনিক দুর্বলতা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর এই ছাত্র সংগঠনটি শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ ও আস্থার জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ে।
এছাড়া নির্বাচনের আগে নেতৃত্ব নির্বাচন ও প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে সংগঠনে অসন্তোষ ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিক ছাত্রশিবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দিয়ে ক্যাম্পাসে সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্রদলের পরাজয় কোনো একক কারণে হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্ব সংকট, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং পরিবর্তিত ছাত্র রাজনীতির বাস্তবতার সম্মিলিত প্রতিফলন।
এছাড়া নির্বাচনে পূর্ব প্রস্তুতি না থাকা, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও শিক্ষার্থীদের মন জয়ে ব্যর্থতাই পরাজয়ের কারণ। এমনকি নিজেদের বিভাগেই ভালো ফলাফল করতে পারেনি ছাত্রদল। শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের বিভাগেই ভরাডুবি হয়েছে সংগঠনটির।
বুধবার জকসু নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছেন ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের প্রার্থীরা। কেন্দ্রীয় সংসদের মোট ২১টি পদের মধ্যে ভিপি, জিএস, এজিএসসহ ১৬টি পদে জয় নিশ্চিত করে শিবির। অপরদিকে তিনটি সম্পাদকীয় ও একটি কার্যনির্বাহী মিলে ৪টিতে জয় পান ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা। নির্বাচনে ভিপি পদে শিবির ও ছাত্রদলের প্রার্থীদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। তবে জিএস পদে দ্বিগুণেরও বেশি ভোটে জিতেছেন শিবিরের জবি শাখার সেক্রেটারি আব্দুল আলিম আরিফ। তার প্রাপ্ত ভোট ছিল ৫৪৭৫।
নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের খাদিজাতুল কুবরা পেয়েছেন ২২২৩ ভোট। ভিপি পদে শিবিরের প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম ৫৫৫৮, আর প্রতিদ্বন্দ্বী একেএম রাকিব ৪৬৮৮ ভোট পেয়েছেন।
নিজ বিভাগে ছাত্রদলের প্রার্থীদের ভরাডুবি : নির্বাচনে ছাত্রদল প্যানেলের প্রার্থীরা নিজেদের বিভাগেই ভালো ফলাফল করতে পারেননি। ছাত্রদলের জিএস প্রার্থী খাদিজাতুল কুবরা ও শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। সেই বিভাগেই ভিপি ও এজিএস পদে ভরাডুবি হয় তাদের। ছাত্রদলের এজিএস প্রার্থী বিএম আতিকুর রহমান তানজিল নিজ বিভাগ ইসলামিক স্টাডিজেই জয়ী হতে পারেননি। বিভাগটিতে শীর্ষ তিন পদেই জয় পেয়েছেন শিবিরের প্রার্থীরা। অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগ থেকে সদস্য পদে ছাত্রদলের ২ প্রার্থী সুলতাস মাহমুদ শুভ ও মনিরুজ্জামান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেই বিভাগেই শীর্ষ তিন পদসহ বেশির ভাগ পদে জয় পায় শিবির।
যথাযথ পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতা : নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল ঘোষণা নিয়ে নিজেদের মধ্যে যথাযথ পরিকল্পনার ঘাটতি ও সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। ভিপি ও জিএস পদে প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যেই স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না। প্যানেল নির্ধারণ করা নিয়ে সংগঠনের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে দেনদরবারে পার হয়ে যায় অনেক সময়। অপরদিকে নির্বাচনের শুরু থেকেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে প্রার্থীদের পরিচিত করানোর দিকে মনোযোগ দেয় শিবির।
প্রার্থীর পরিচিতি ঘাটতি : ছাত্রদলের প্যানেলের অধিকাংশ প্রার্থীর সঙ্গে তেমন পরিচিতি ছিল না সাধারণ শিক্ষার্থীরা। জবি ছাত্রদলের নেতৃত্বের পর্যায়ে এখনো সিনিয়ররা থাকায় জুনিয়রদের পরিচিতির সুযোগ হয় না। অভিযোগ রয়েছে, সিনিয়র নেতারাই চান না, জুনিয়ররা পরিচিত হয়ে উঠুক। অপরদিকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা ও শিবিরের দায়িত্বে থাকার সুবাধে শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচিতি ছিল শিবিরের ভিপি প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম। তাছাড়া শিবিরের প্রার্থীদের বড় অংশই জুনিয়র পর্যায়ের। তারাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে বড় ভূমিকা রাখে।
জুলাই-পরবর্তী সময়ে দলগুলোর ভূমিকার মূল্যায়ন : ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পরই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মন জয়ে তৎপর হয় শিবির। মেধাবী সংবর্ধনা, ক্যাম্পাসে ও ছাত্রী হলে নিরাপদ পানি নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন আয়োজন শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে। অপরদিকে ছাত্রদলের সবচেয়ে শক্তিশালী ইউনিট হলেও দলীয় কোন্দলে বিপর্যস্ত ছিল পুরোটা সময়। সর্বশেষ আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা নিয়ে দলীয় কোন্দল ও বিভাজন আরও বৃদ্ধি পায়।
বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রভাব : অভ্যুত্থান পরবর্তী নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জাতীয় পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছে জবি শাখা ছাত্রদল। ডাকসুর নির্বাচিত নারী নেত্রীর হিজাব নিয়ে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব শামসুল আরেফিনের বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এরপর ৩০ ডিসেম্বর জকসু স্থগিত হওয়ার দিন নারায়ে তাকবির স্লোগান দেওয়ার সময় ইনকিলাব মঞ্চের নেত্রী থেকে মাইক কেড়ে নেয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এটি নিয়েও সারা দেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সবশেষ ৬ জানুয়ারি নির্বাচনের দিন শিবিরের ভিপি প্রার্থীর স্ত্রীকে হেনস্তা করেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় তার হিজাবও খুলে নেওয়া হয়। একই দিন দাড়ি-পাঞ্জাবি দেখে জামায়াত কর্মী সন্দেহে এক ব্যবসায়ীকে মারধর করেন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী নওয়াজ শরীফ বলেন, শিক্ষার্থীরা প্রথম নিজেদের নিরাপত্তা চায়, এরপর চিন্তা করে কারা ক্যাম্পাসের জন্য কাজ করতে পারবে। এক্ষেত্রে বিগত সময় নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সমালোচিত ছিল ছাত্রদল। অপরদিকে শিক্ষার্থী উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে শিবির। রাজনীতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর বলেন, ছাত্রদল পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময় পায়নি বলেই আমার কাছে মনে হয়। অন্যদিকে শিবিরের প্রস্তুতিটা ছিল দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক।
