Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

সংলাপে আমির খসরু

সব দল মিলে সবকিছুর সমাধান বাস্তবসম্মত নয়

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সব দল মিলে সবকিছুর সমাধান বাস্তবসম্মত নয়

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মঙ্গলবার ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হচ্ছে -যুগান্তর

Advertisement

সব দলের ঐকমত্য প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক-এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দল একসঙ্গে বসে দেশের সব সমস্যার সমাধান করবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ হিসাবে বলেন, প্রতিটি দলের নিজস্ব দর্শন, চিন্তা ও রূপরেখা আছে। গণতন্ত্র মানে ঐকমত্যের নামে ভিন্নমতকে চাপা দেওয়া নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজ নিজ প্রস্তাব নিয়ে জনগণের কাছে যেতে হবে এবং জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট অনুযায়ী কাজ করতে হবে। মঙ্গলবার দুপুরে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের উপস্থাপনায় এ সময় সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. রওনক জাহান, গণফোরামের অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্কাফী রতন, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, রাজনীতিবিদ ডা. তাসনিম জারা, বাসদের বরিশাল জেলা সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তীসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের নেতা ও স্বতন্ত্র প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

আমির খসরু বলেন, কোনো সরকার এককভাবে দেশের সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। কার্যকর সমাধান ও বাস্তব ডেলিভারির জন্য সরকারকে সিভিল সোসাইটি, বেসরকারি খাত, এনজিওসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে নিয়ে অংশীদারির ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে এমন একটি পরিবেশের প্রয়োজন ছিল, যেখানে ভিন্নমতের মানুষ একসঙ্গে বসে মুক্তভাবে কথা বলতে পারবে। সেই পরিবেশ এখন তৈরি হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে সরকারকে একক সিদ্ধান্তের পথ থেকে সরে এসে অংশীদারভিত্তিক শাসনব্যবস্থায় যেতে হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের একার পক্ষে কার্যকর ডেলিভারি সম্ভব নয়। এসব ক্ষেত্রে সিভিল সোসাইটি, বেসরকারি খাত ও অন্যান্য অংশীজনকে যুক্ত না করলে নীতিনির্ধারণ বাস্তবে ফলপ্রসূ হয় না। রাজনীতিবিদদের জবাবদিহি প্রসঙ্গে আমির খসরু বলেন, রাজনীতিকদের ওপর জনগণের আস্থা তৈরির দায়িত্ব রাজনীতিকদেরই। বক্তৃতা দিয়ে এই আস্থা তৈরি করা যায় না। সংসদের ভেতরে ও বাইরে কার্যকর জবাবদিহির মাধ্যমেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। ক্ষমতায় গেলে রাজনীতিকদের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার প্রবণতার কথাও তুলে ধরেন খসরু। তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর অনেক সময় একটি ‘আইসোলেশন বাবল’ তৈরি হয়, যেখানে ক্ষমতা মানুষের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা এখন অনেক উঁচুতে পৌঁছেছে। এই পরিবর্তন যারা বুঝতে পারবে না, তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

আমির খসরু বলেন, বিএনপি একটি লিবারেল ডেমোক্রেটিক দল হিসাবে অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণে বিশ্বাস করে। শুধু রাজনীতিতে গণতন্ত্র রেখে অর্থনীতিকে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক পৃষ্ঠপোষকতার মধ্যে রাখলে সাধারণ মানুষ বঞ্চিতই থেকে যায়।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা এখনও পূর্ণতা পায়নি। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নাগরিক সমাজ ও শিক্ষার্থীদের যে ভূমিকা ছিল, সেই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্র সংস্কার, মানবাধিকার রক্ষা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দাবি সামনে এসেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও আর্থসামাজিক বাস্তবতায় কাঠামোগত সংস্কার কার্যকরভাবে এগোয়নি। গত দেড় দশকে মতপ্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় কেবল একটি সুষ্ঠু নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, সেটি অর্থবহ ও কার্যকর না হলে গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্ভব নয়। জাতীয় সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে ও জনগণের আস্থা ফেরাতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিকল্প নেই।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ১৯৭১, ১৯৯০ ও ২০২৪ এই তিনটি সময় বাংলাদেশের ইতিহাসে একই সূত্রে গাঁথা। এই তিন পর্যায়ের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য বা দ্বন্দ্ব নেই। সামাজিক সুবিচার, মানবিক মর্যাদা এবং বৈষম্যবিরোধী চেতনা ধারাবাহিকভাবেই এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। বিচার, সংস্কার, নির্বাচন ও নাগরিক অধিকার, এই চারটি বিষয় বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় এখনো পেশিশক্তি ও ব্যবসায়ীরা অগ্রাধিকার পাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক রওনক জাহান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যে প্রক্রিয়ায় মনোনয়ন দিচ্ছে, সেখানে আগের প্রক্রিয়া থেকে কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে, মাঠ পর্যায়ের মতামতের ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে কি না? গত এক বছরে কতটুকু পরিবর্তন আনতে পেরেছে? এখনো পেশিশক্তি ও ব্যবসায়ী প্রার্থীরা অগ্রাধিকার পাচ্ছেন বলেই মনে হয়েছে।

জনগণ ভোট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে নারীদের নির্বাচনে আনা হবে বলে জানিয়েছেন জামায়াত নেতা সাইফুল আলম খান মিলন। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তার কাছে নারীদের নমিনেশনের বিষয়ে জানতে চান। জবাবে মঞ্চে থাকা আমির খসরুর দিকে তাকিয়ে সাইফুল আলম খান বলেন, এ বিষয়ে আমরা একা পিছিয়ে আছি তা নয়। আমাদের বড় দলও পিছিয়ে আছে। আমরা একসঙ্গে এগোব ইনশাআল্লাহ।

আবদুল্লাহ আল ক্কাফী রতন বলেন, জুলাই সনদ ’৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি সংরক্ষণের গ্যারান্টি দেয়নি। সে কারণে আমরা এই সনদ স্বাক্ষর করিনি। আমরা মনে করি, যে গণভোটটা হচ্ছে এটা অপ্রয়োজনীয়।

মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আজকে এখানে দাঁড়ানোর একটা সুযোগ নিতে চাই। সেটা হচ্ছে, ক্ষমা প্রার্থনা। আপনারা জানেন, আমরা একটা নতুন রাজনীতির, নতুন বন্দোবস্তের কথা বলেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরোনো বন্দোবস্তের ভেতরে আমাদের ঢুকে যেতে হয়েছে। এজন্য আমি নাগরিকদের দায়ী করব না। প্রথমত, নিজেদেরকে দায়ী করব। আপনারা আমাদেরকে ক্ষমা করবেন। কারণ আমরা যে প্রত্যাশা করেছিলাম, এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্রোত এবং নির্বাচন আমাদের সেখানে দাঁড়াতে দেয়নি। এজন্য দায়ভার যদি ভাগ করি, তাহলে ৬০ ভাগ দায় আমাদের মধ্যে আসে। দিনশেষে নির্বাচন নামক যে জোয়ারটা আসে, সেখানে আমাদের আটকে যেতে হয়, ভেসে যেতে হয়।

ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা বলেন, জনগণ পরিবর্তন চায়। তারা পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আর গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। এই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই আমি আমার দল থেকে সরে এসে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

সংলাপে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম বলেন, আজ যদি ২ হাজার টাকায় ভোট বিক্রি করেন, তবে আগামী পাঁচ বছর আপনার ভাগের অন্তত ২০০ কোটি টাকা বিভিন্নভাবে এস্টাবলিশমেন্টের পকেটে চলে যাবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম