Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

ঋণ ছাড়ের আলোচনা করতে আসছে প্রতিনিধিদল

নতুন সরকারের জন্য আইএমএফের ফাঁদ

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নতুন সরকারের জন্য আইএমএফের ফাঁদ

Advertisement

আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) মৌলিক শর্তগুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। তবে অনেক শর্তই আংশিকভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। অনেক শর্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে তারা সংস্থাটির সঙ্গে দরকষাকষি করেছে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থ রক্ষা করতে শর্তের বাস্তবায়ন যথাসম্ভব পিছিয়ে দিয়েছে। যে কারণে আইএমএফ ঋণের ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ডিসেম্বরে ছাড় করেনি। তারা ওই সময়েই জানিয়ে দিয়েছে, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে এবং শর্ত বাস্তবায়নের রাজনৈতিক অঙ্গীকার আদায় করেই ঋণের কিস্তির অর্থ ছাড় করবে, এর আগে নয়। আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়ন করলে অনেক ক্ষেত্রেই তা জনস্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। ফলে নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা হোঁচট খাবে। তাই আইএমএফের শর্তগুলো নতুন সরকারের কাছে একটি ফাঁদ হিসাবে দেখা দিয়েছে। শর্ত বাস্তবায়ন করলে জনঅসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাস্তবায়ন না করলে সংস্থাটি ঋণ ছাড় করবে না। তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়বে সরকার।

এমন পরিস্থিতিতে এখন নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ঋণের কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা করতে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের একটি মিশন বাংলাদেশে আসছে। তারা বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, অর্থমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সরকারের পক্ষ থেকে শর্ত বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পাওয়া গেলে ঋণের কিস্তি ছাড় করবে, অন্যথায় করবে না। আর শর্ত বাস্তবায়ন করতে সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার দরকার-এ বিষয়টি আইএমএফ ইতোমধ্যে সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে আইএমএফের ঋণের অন্যতম শর্ত হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু করা সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া, ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার নির্ধারণ পদ্ধতি পুরোপুরিভাবে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, মূল্যস্ফীতির হার কমাতে মুদ্রানীতির উপকরণগুলোকে ব্যবহার করা অর্থাৎ সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী রাখা। এ ছাড়া ভর্তুকি হ্রাস করা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো। রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পদ্ধতিকে আলাদা করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা আরও বাড়ানো ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে চলতে দেওয়া উল্লেখযোগ্য।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু করা সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এনবিআর সংস্কার করতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। এতে রাজস্ব আয় কমে গিয়েছিল। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংস্কার করতে গিয়ে ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) বাধার মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন আমলারা। যে কারণে এটি আটকে গেছে। এ রকম প্রায় সব খাতেই বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। এসব সংস্কার করলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি উপকৃত হবে, কিন্তু স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রকট হবে। যে কারণে বাস্তবায়নে বাধা আসছে। এ কারণেই আইএমএফ বলেছে, সংস্কার বাস্তবায়ন করতে সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার জরুরি।

ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার নির্ধারণ পদ্ধতি পুরোপুরিভাবে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার মানে হচ্ছে এর দাম বাড়ানো। আইএমএফ মনে করে, ডলারের বিপরীতে টাকা অতিমূল্যায়িত। ডলারের দাম আরও বাড়ানো উচিত। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে ভিন্ন কথা। ডলারের দাম এখন বাজারই নির্ধারণ করছে। বরং ডলারের দামে স্থিতিশীলতা রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করছে। আইএমএফ বলছে, ডলারের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। ডলারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক দায় বেড়ে যাবে। টাকার মান কমে যাবে। পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমবে। মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মূল্যস্ফীতির হার কমাতে মুদ্রানীতির উপকরণগুলোকে ব্যবহার করা অর্থাৎ সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী রাখায় ইতোমধ্যে উদ্যোক্তাদের ক্ষোভের মুখে পড়েছে সরকার। তারা ঋণের সুদের হার কমাতে জোর দাবি করেছেন। এত বেশি সুদ দিয়ে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিশ্রুতি দিয়েও সুদের হার কমাতে পারেনি। কারণ মূল্যস্ফীতি এখনো ঊর্ধ্বমুখী। এদিকে সুদের হার চড়া রাখার কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ঋণ প্রবাহ বাড়ছে না। ফলে কর্মসংস্থানের গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। এতে বেকারত্ব বাড়ছে। যা মানুষের আয় কমিয়ে দিচ্ছে। জীবনযাত্রার মান বাড়াতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভর্তুকি হ্রাস করা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর শর্ত বাস্তবায়ন করলে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ বাড়বে। পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এতে মানুষের ভোগান্তিও বাড়বে।

রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পদ্ধতিকে আলাদা করার শর্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকার বড় বাধার মুখে পড়েছিল। এতে রাজস্ব আদায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে গেলে ভোক্তার ওপর চাপ বাড়বে। তখন সরাসরি ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা আরও বাড়ানো ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে চলতে দিলে সরকারের রাজনৈতিক ও আমলাদের হস্তক্ষেপ হ্রাস পাবে। যে কারণে এটিও বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জিং।

গত বছরের ডিসেম্বরে আইএমএফের ঋণের ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় করার কথা ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময় ও নতুন সরকারের কাছ থেকে শর্ত বাস্তবায়নের অঙ্গীকার আদায় করতে তা স্থগিত করা হয়। এবারের আলোচনায় শর্ত বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করলেই শুধু তারা ঋণের ষষ্ঠ কিস্তির সঙ্গে সপ্তম কিস্তি মিলে দুটি কিস্তি একসঙ্গে জুনে ছাড় করতে পারে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম