স্কুলে ফিরছে ভর্তি পরীক্ষা
শিশুদের মানসিক চাপ সৃষ্টির শঙ্কা
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে। সোমবার রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা বিভাগের এক আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। তবে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হলেও বেশ কিছু সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে ছোট শিশুদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণত প্রাথমিক বা নিম্ন শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার বয়সে শিশুরা পরীক্ষার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে না। ফলে অল্প বয়সেই তাদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ ও প্রতিযোগিতার চাপ তৈরি হতে পারে। এতে কোচিং নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য অনেক অভিভাবক শিশুদের কোচিং সেন্টারে পাঠাতে শুরু করবেন। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় বাণিজ্যিক কোচিং সংস্কৃতি আরও বিস্তার লাভ করতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ তৈরি হবে। তাতে সামাজিক বৈষম্য বাড়তে পারে। আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা ভালো কোচিং ও প্রস্তুতির সুযোগ পাবে, কিন্তু নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা সেই সুবিধা পাবে না। ফলে মেধা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়তে পারে। প্রশ্নপত্র ফাঁস বা অনিয়মের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস বা দুর্নীতির ঘটনা ঘটলে পুরো ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে। অতিরিক্ত প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। লটারি পদ্ধতি তুলনামূলক সহজ হলেও ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন করতে হলে প্রশ্ন তৈরি, পরীক্ষা নেওয়া, খাতা মূল্যায়নসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের চাপ বাড়বে।
স্কুলে ভর্তি ব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা লটারি পদ্ধতি ধাপে ধাপে বাতিল করা হবে এবং ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘লটারি পদ্ধতি মেধা যাচাইয়ের কোনো কার্যকর উপায় নয়। অংশীজনদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও যুক্তিসংগত পদ্ধতি প্রয়োজন।’
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই পরীক্ষা অত্যন্ত সহজ ও শিশুবান্ধব হবে এবং এতে শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হবে না। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এমন কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নেওয়া হবে না, যা তাদের মানসিক চাপ বাড়ায়। তিনি বলেন, ভর্তি পরীক্ষা চালু হলেও যাতে কোচিং বাণিজ্য বৃদ্ধি না পায়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক থাকবে। তিনি জানান, প্রয়োজনে স্কুলের ভেতরেই শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষা একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। যে ধরনের পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাতে যারা কোচিং বা প্রাইভেট পড়ে, তারাই মূলত এগিয়ে থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতিই তুলনামূলকভাবে ভালো। তবে লটারি যেন স্বচ্ছভাবে হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণায় ভর্তি কোচিং বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং ভর্তি বাণিজ্য উৎসাহিত হবে বলে মনে করছে অভিভাবক ঐক্য ফোরাম। সংগঠনটির সভাপতি মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, বিগত ২০১৯ সালে করোনাকালীন স্কুলে ভর্তিতে লটারি চালু করা হয়েছিল। এর ফলে রাজধানীর নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি বাণিজ্য কমে এসেছিল। ভর্তি কার্যক্রম শুরু হবে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে। কোনো মতেই নামকরা স্কুলের ভর্তি বাণিজ্য বন্ধ করতে পারবে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ভর্তি বাণিজ্য বন্ধ করার জন্যই করোনার পরও লটারি অব্যাহত রাখতে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সমর্থন ছিল বিধায় কয়েক বছর ধরে কোনো ভর্তি বাণিজ্য হয়নি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভর্তির আদেশে বলা হয়, বর্তমানে সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি প্রক্রিয়া বাতিলপূর্বক অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, এ অবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর ও ১৯ নভেম্বর তারিখের স্মারকে জারীকৃত সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালা দুটি নির্দেশক্রমে বাতিল করা হলো। তবে কী প্রক্রিয়ায় আগামীতে স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে আদেশে জানানো হয়। গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য পরীক্ষা না নিয়ে সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডিজিটাল লটারি করা হচ্ছে। প্রথমে শুধু প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের লটারিতে ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।
মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণিতেই শিক্ষার্থী ভর্তিতে লটারি শুরু হয়। চলতি বছরও প্রথম থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হয়েছিল।
