আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক
যুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ : সহায়তা চায় বাংলাদেশ
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ সচিবালয়ে আইএমএফের সফররত এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক করেন। ছবি: পিআইডি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে জুনে আইএমএফের ঋণের কিস্তি ছাড় চাওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ঢাকায় সফররত আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের বৈঠকে এসব সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়। তবে এপ্রিলে ওয়াশিংটনে আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে ঋণের কিস্তি নিয়ে আলোচনা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব কার্যালয়ে বৈঠক শেষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা দেশের অর্থনীতিকে খারাপ অবস্থায় পেয়েছি। সেখান থেকে উত্তরণে প্রভূত সংস্কার দরকার। এর সঙ্গে যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারে চ্যালেঞ্জ আছে, কর-জিডিপি অনুপাত একেবারে নিম্ন পর্যায়ে। এটাতে উন্নতির জন্য আমরা কী করতে পারি, সে বিষয়গুলো নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ঋণ নিয়ে দাতা সংস্থাটির এটি প্রথম বৈঠক।
ঋণের কিস্তি ছাড়ের বিপরীতে আইএমএফের শর্ত প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেছেন-‘সব (শর্ত বাস্তবায়ন) একসঙ্গে করা যাবে না, আমরা বরং আমাদের মতো করে করব।’ যেসব শর্ত আছে, সেগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করা হবে। একই সময়ে কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান বাংলাদেশ নতুন করে কোনো ঋণের অনুরোধ করেছে কিনা? জবাবে তিনি সরাসরি কিছু না বললেও এক ধরনের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, অর্থায়ন ও নীতিগত আলোচনা একসঙ্গেই এগিয়ে চলছে। যে কোনো অর্থায়নসংক্রান্ত আলোচনা সব সময়ই নীতিগত আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থমন্ত্রীর এ বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
ভিন্ন প্রশ্নে কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন বলেন, চলমান যুদ্ধে বিশ্বের সব দেশে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এর ফলে সৃষ্ট অস্থিরতা অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশও তার বাইরে নেই। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফ নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
সূত্রমতে, এপ্রিলে ওয়াশিংটনে শুরু হচ্ছে আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক। তা শেষে আইএমএফের একটি মিশন পুনরায় ঢাকায় আসবে। সেই মিশনের প্রতিবেদন আইএমএফের পরিচালনা পর্ষদে পেশ হবে। জুনে পর্ষদ বৈঠক আছে; পরের মাস জুলাইয়েও আছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সফররত আইএমএফ দলের কাছে জুনের পর্ষদ বৈঠকে কিস্তি ছাড়ের প্রস্তাব উত্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে। আভাস পাওয়া গেছে, শেষ পর্যন্ত তা জুলাইয়ে গড়াতে পারে।
আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। আইএমএফ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট সত্ত্বেও পরিবহণে কোনো সমস্যা হয়নি। ঈদের সময় সবাই বাড়ি যেতে পেরেছেন, ভাড়া বাড়েনি, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ছিল। তবে ‘উন্নয়ন প্রকল্প থমকে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই উন্নয়ন প্রকল্পের এই অবস্থা। আমরা এগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করব। আর্থিক সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।’ এর জন্য উদারীকরণ, ব্যবসা সহজীকরণ, ব্যবসার খরচ কমানো-নানা বিষয়ে নজর দেওয়া হচ্ছে। আগামী বাজেটেই এসবের প্রতিফলন থাকবে।
তবে ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সবাইকে সংযমী হওয়া এবং সরকারকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, গার্মেন্ট খাতে প্রতিবছর ঈদের আগে যে সমস্যাগুলো হয়, এবার তেমন কোনো অস্থিরতা ছিল না। কারণ এগুলো আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফল। আমরা আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে রমজানজুড়ে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু সরকার একা পারবে না। আমরা দেশবাসীর কাছে আবেদন করব সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে, সহানুভূতিশীল হতে হবে, সংযম আমাদের মধ্যে আনতে হবে।
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় : বাংলাদেশের অনুকূলে আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচি এগিয়ে নিতে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। সংস্থাটির ঢাকা সফররত প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দুই পক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বলা হয়, বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচি এগিয়ে নিতে আগ্রহী। আইএমএফ ও ঋণ কর্মসূচি চলমান রাখতে চায়। চলমান ৫৫০ কোটি ডলারের সঙ্গে আরও বাড়তি ঋণ অনুমোদন দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ। জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলার জন্য এ তহবিল চাওয়া হয়েছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও এই বাড়তি তহবিলের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল।
আইএমএফ জানিয়েছে, ঋণ কর্মসূচি চলমান রাখার প্রত্যাশা থেকে এখন দুই পক্ষই আরও আলোচনা চালাবে। আগামী ১৩ থেকে ১৮ এপ্রিল ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেবে। তখন বৈঠকের সাইড লাইনে এ বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের আরও আলোচনা হবে। ওই আলোচনা ফলপ্রসূ হলেই কেবল এপ্রিলের শেষ দিকে বা মে মাসের প্রথম দিকে ঢাকায় আইএমএফের একটি মিশন আসবে। তারা সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে ঋণের শর্তগুলো চূড়ান্ত করবে।
