ঝড় শিলাবৃষ্টি
বজ্রপাতে ঝিনাইদহ ফরিদপুর ও নওগাঁয় ৪ কৃষকের প্রাণহানি
রংপুরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ও পঞ্চগড়ে গাছচাপায় দুই বৃদ্ধার মৃত্যু * লালমনিরহাটে খোলা আকাশের নিচে শত শত পরিবার * বিভিন্ন স্থানে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা এলাকায় শুক্রবার মধ্যরাতে আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড বসতবাড়ি। শনিবার তোলা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঝিনাইদহ, ফরিদপুর ও নওগাঁয় বজ পাতে চার কৃষকের প্রাণহানি হয়েছে। রংপুরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট এবং পঞ্চগড়ে ঝড়ে গাছ উপড়ে চাপা পড়ে মারা গেছেন দুই বৃদ্ধা। লালমনিরহাটে শিলাবৃষ্টিতে শত শত ঘরের টিন ছিদ্র হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে চরম কষ্টে দিনযাপন করছে। বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে ফসলের। দেশজুড়ে বজ সহ বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। এ সময় কমবে তাপমাত্রা। মঙ্গলবার পর্যন্ত বৃষ্টির প্রবণতা থাকবে। আর বুধবার থেকে বাড়তে পারে গরম। ব্যুরো, স্টাফ রিপোর্টার ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
ঢাকা : ঢাকাসহ সারা দেশে বজ সহ বৃষ্টির আশঙ্কার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, আজসহ আগামী দুদিন দেশের সব বিভাগেই কয়েক জায়গায় দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ সহ বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।
শনিবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু এলাকায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া, বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি হতে পারে। একই পরিস্থিতি পরদিনও থাকতে পারে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এ সময় সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্তু এই তাপমাত্রা কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। তবে বুধবারের পর বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে তাপমাত্রা আবার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়ার সিনপটিক অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়, লঘুচাপের একটি বর্ধিতাংশ বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। পাশাপাশি মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করায় বৃষ্টিপাতের এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
শনিবার আবহাওয়া অফিস জানায়, ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে দিনাজপুরে। এছাড়া রংপুরে ৪০ মিলিমিটার, ডিমলায় ৩২ মিলিমিটার, রাজারহাটে ২৯ মিলিমিটার এবং কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ১৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। বগুড়া, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ, খুলনাসহ অন্যান্য অঞ্চলেও হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এদিকে ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায় ৩৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল তেঁতুলিয়ায় ১৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় আজকের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সাময়িক এই বৃষ্টিপাতের ফলে গরমের তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে, তবে মাসের শুরুতেই আবার তাপমাত্রা বাড়ার ইঙ্গিত রয়েছে।
ঝিনাইদহ : শৈলকুপা উপজেলার ওমেদপুর ইউনিয়নের খড়িবাড়িয়া গ্রামে বজ পাতে দুই কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৪ জন। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে গ্রামের মাঠে এ ঘটনা ঘটে। হতাহতের খবর নিশ্চিত করেছেন শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আল মামুন। মৃত ব্যক্তিরা হলেন খড়িবাড়ী গ্রামের প্রকাশ বিশ্বাসের ছেলে অপু এবং সুনীল বিশ্বাসের ছেলে সমির। গুরুতর আহতদের মধ্যে রনজিৎকে শৈলকুপা এবং অপর তিনজনকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে বলে জানান শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। হতাহতরা সকালে মাঠে পেঁয়াজখেতে কাজ করতে যান।
নওগাঁ : পত্নীতলায় জমি থেকে গম কাটার সময় বজ পাতে আশরাফ আলী নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও চারজন। শনিবার সকালে উপজেলার শিহারা ইউনিয়নের তেপুকুরিয়া মাঠে এ ঘটনা ঘটে। মারা যাওয়া আশরাফ আলী উপজেলার শীতল গ্রামের মৃত আয়নাল হকের ছেলে। পত্নীতলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, মাঠে গম কাটতে গিয়ে বজ পাতে কৃষক আশরাফের মৃত্যু হয়েছে। আহত বাকি চারজন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রংপুর : আকস্মিক ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রাতভর দমকা হাওয়া ও শিলাবৃষ্টির তাণ্ডবে উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক নারীর মৃত্যু এবং একই পরিবারের আরও চারজন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার সকালে নগরীর বাহার কাছনা রামগোবিন্দ বাঙ্গীটারী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। মারা যাওয়া কাজলী বেগম ওই এলাকার চা বিক্রেতা সাইফুল ইসলামের স্ত্রী। পুলিশ জানায়, শুক্রবার রাতের ঝড়ে সাইফুল ইসলামের বাড়ির বিদ্যুতের মিটারের একটি তার ছিঁড়ে গিয়ে টিনের ঘরের সঙ্গে লেগে থাকে। এতে পুরো ঘর বিদ্যুতায়িত হয়ে পড়ে। শনিবার সকালে নামাজ আদায়ের জন্য ঘরের দরজায় হাত দিলে কাজলী বেগম বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। তাকে বাঁচাতে গিয়ে স্বামী সাইফুল ইসলাম, মেয়ে সাবরিনা, ভাসুর হাফিজুল ইসলাম ও ভাবি রত্না বেগমও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আহত হন। তাদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে কাজলী বেগমের মৃত্যু হয়। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেন বাহার কাছনা এলাকার সিটি পুলিশ সদস্য রফিকুল ইসলাম।
ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে ভুট্টা, ধান ও বিভিন্ন শাকসবজির খেত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। অনেক খেতেই শিলার আঘাতে গাছ ভেঙে পড়েছে এবং ফলন নষ্ট হয়ে গেছে। জেলা কৃষি কর্মকর্তা রোকনুরজ্জামান বলেন, রাত থেকে ভোর পর্যন্ত দমকা হাওয়া ও বৃষ্টিপাতে কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রংপুর আবহাওয়া অফিস জানায়, শুক্রবার রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত জেলায় ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মৌসুমি বৈরী আবহাওয়ার কারণে এ ধরনের ঝড়বৃষ্টির প্রবণতা আরও কিছুদিন থাকতে পারে।
পঞ্চগড় : ঝড়ে গাছ উপড়ে বসতঘরের ওপর পড়ে চাকাতি বালা নামে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার রাত ১টায় পঞ্চগড় সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের চাঁনপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। চাকাতি বালার ছেলে হরেন চন্দ্র বলেন, প্রচণ্ড ঝড়ে বাড়ির পাশের একটি বিশাল গাছ উপড়ে ঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘরটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং চাকাতি বালা গাছের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা সুলতানা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাকাতি বালার পরিবারের হাতে ২০ হাজার টাকা, চাল ও শুকনা খাবার তুলে দেন।
কিশোরগঞ্জ : নজিরবিহীন প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টিতে কিশোরগঞ্জে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বোরো চাষিদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রাথমিকভাবে সংগৃহীত হিসাবানুযায়ী ৩ হাজার ৮৬৪ হেক্টর বোরো জমি এমন ক্ষয়ক্ষতির দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে এর পরিমাণ ১০ হাজার হেক্টরেরও বেশি বলে দাবি ভুক্তভোগী বোরো চাষিদের।
লালমনিরহাট : লালমনিরহাটে ঘূর্ণিঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে বিস্তীর্ণ জনপদ। শুক্রবার মধ্যরাতে জেলার পাঁচটি উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শিলার আঘাতে শত শত ঘরের টিন ছিদ্র হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। বর্তমানে অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে চরম কষ্টে দিনযাপন করছে। শুক্রবার রাত ১২টার দিকে শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া এবং বড় আকারের শিলাবৃষ্টি। ঝড়ে অনেক ঘরবাড়ির চাল ও বেড়া উড়ে গেছে। বিশাল আকৃতির শিলার আঘাতে ঘরবাড়ির টিন ছিদ্র হয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি সামগ্রী নষ্ট হয়ে গেছে। ঝড়ে উপড়ে পড়া গাছপালা পড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে পুরো জেলায়। শনিবার সকালে অনেক পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির পাশে খোলা মাঠে বা পলিথিন টাঙিয়ে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে।
লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মীর ফয়সাল আলী বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ মাঠপর্যায়ে চলছে। আমরা ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবগত করেছি। সরকারি বরাদ্দ হাতে পেলেই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।’
ফরিদপুর : ফরিদপুরে বাড়ির পাশের মাঠে কাজ করার সময় বজ পাতে দেলোয়ার হোসেন নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে উপজেলার মেনদিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত কৃষক দেলোয়ার হোসেন মেনদিয়া গ্রামের আফসার সরদারের ছেলে।
কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে ঝড়সহ প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুক্রবার রাতে ঝড়সহ শিলাবৃষ্টিতে বোরো ধানসহ শাকসবজির ক্ষতি হয়। কৃষকরা জানান, এ মৌসুমে শিলাবৃষ্টি হওয়ায় চলতি মৌসুমে পাট, সবজিসহ বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হবে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, হঠাৎ শিলাবৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখনো ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা যায়নি।
