গভর্নরের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠক
ঋণের সুদহার কমানোর দাবি
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের কাছে একগুচ্ছ দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো-ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার বাড়িয়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার দাবিও ছিল। তবে গভর্নর বেশকিছু দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গভর্নরের সঙ্গে সোমবার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) মহাসচিব মো. আলমগীর। বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
এফবিসিসিআই মহাসচিব বলেন, রপ্তানিকারকদের সহায়তায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে গঠিত ইডিএফ তহবিল একসময় ৭ বিলিয়ন ডলার থাকলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। ব্যবসায়ীরা এ তহবিল পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার দাবি জানিয়েছেন।
গভর্নর এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে ধাপে ধাপে তহবিল বৃদ্ধির আশ্বাস দিয়েছেন। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স’র (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘ইডিএফ ফান্ড বাড়ানোর জন্য বলা হয়েছে। গভর্নর এটার সঙ্গে একমত হয়েছেন। আইএমএফের কারণে এটা কমানো হয়েছে। আমরা আড়াই বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নতি করার কথা বলেছি। পরবর্তী সময়ে তা আট বিলিয়ন করার কথা বলা হয়েছে।’ ইডিএফ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি তহবিল, যেখানে ব্যবসায়ীরা কাঁচামাল আমদানির জন্য স্বল্প সুদে ডলারে ঋণ পান।
সুদহার কমানোর দাবি-এফবিসিসিআই মহাসচিব সুদহার প্রসঙ্গে বলেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সুদহার স্থিতিশীল রাখা জরুরি। পর্যায়ক্রমে তা এক অঙ্কে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে বলা হয়, সরকারি খাতে ঋণবৃদ্ধির চাপ কমিয়ে উৎপাদনমুখী খাতে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তিন মাস কেউ ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তাকে খেলাপি করা হয়। সেটা বাড়িয়ে ছয় মাস করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এক প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে অন্য প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়ে যায়, সেটা বন্ধ করতে বলেছি। এছাড়া ঋণ পুনঃতফসিল করার পর সময় ৪ থেকে ৫ বছর দেওয়া হয়, তা বৃদ্ধি করে ১০ বছর করার দাবি জানানো হয়েছে। সভায় জ্বালানি ব্যয় কমাতে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কম সুদে ঋণসুবিধা চালুর সুপারিশ করেছে এফবিসিসিআই।
উচ্চসুদের কারণে বিনিয়োগে অনাস্থা-এদিন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) পরিচালনা পর্ষদ। এ সময় ঢাকা চেম্বার সভাপতি তাসকীন আহমেদের নেতৃত্বে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মধ্যে অংশ নেন ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মান ও পরিচালনা পর্ষদের অন্য সদস্যরা।
সাক্ষাৎকালে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬.০৩%-এ নেমে এসেছে, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং বর্তমানে নীতি সুদ হার ১০% পর্যায়ে রয়েছে, এর ফলে ঋণের সুদহার প্রায় ১৬-১৭% এ পৌঁছেছে। বর্তমান অবস্থাকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য সংকটের প্রতিফলন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর কারণে ব্যাংক থেকে অর্থায়ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্রমেই ব্যয়বহুল ও অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে পড়ছে এবং বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং স্বল্প মুনাফাভিত্তিক উৎপাদনশীল শিল্পের জন্য মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। বিষয়টি মোকাবিলায় নীতি সুদহার ক্রমান্বয়ে কমানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাত, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং এসএমই খাতের মতো অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকিযুক্ত ঋণসুবিধা চালুর প্রস্তাব করেন ঢাকা চেম্বার সভাপতি। যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ঋণ গ্রহণ ও ঋণ প্রদানে সুদহারের মধ্যে বড় ব্যবধানের কারণে ৫%-এরও বেশি স্প্রেড রেট বিদ্যমান রয়েছে, যা ব্যাংকিং খাতে বিশেষ করে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে এবং সেই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগে নিম্নমুখী প্রবণতা সৃষ্টি করেছে।
দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শক্তিশালী সুশাসন নিশ্চিতের বিষয়ে ডিসিসিআই সভাপতি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালা ৯ মাস থেকে ৩ মাসে নামিয়ে আনা, ব্যবসা পরিচালনায় উচ্চ ব্যয়, জ্বালানি সংকট এবং কম চাহিদার মতো সমস্যায় থাকায় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। বিষয়টি বিবেনায় নিয়ে প্রকৃত (অনিচ্ছাকৃত) খেলাপিদের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা পুনর্বিবেচনা করার পাশাপাশি ঋণ শ্রেণিকরণের সময়সীমা কমপক্ষে ৬ মাস পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেন তাসকীন আহমেদ।
সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর বলেন, বিগত বছরগুলোতে সামগ্রিক অর্থনীতি বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পণ্য, সেবা ও রপ্তানি বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং এ অবস্থা থেকে উত্তরণে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের কোনো বিকল্প নেই, বিশেষ করে দেশের এসএমই খাত বা ক্ষুদ্র ঋণ ও কৃষি ব্যবস্থাপনার ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে, যার মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসবে ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। দেশে দীর্ঘসময়ের বজায়ে থাকা উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য লজিস্টিক ও পণ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যয়ের উচ্চ হার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিরসনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
