সংরক্ষিত নারী আসনের তফসিল আজ
বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের জীবনবৃত্তান্তের স্তূপ নয়াপল্টনে
Advertisement
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের তফসিল আজ। এ আসনে ভোটগ্রহণ হবে ১২ মে। ইতোমধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন ঘিরে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে। মনোনয়ন পাওয়ার আশায় দলটির নেত্রীদের অধিকাংশই এখন ঢাকায়। লবিং-তদবিরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তারা। জীবনবৃত্তান্তের স্তূপ জমেছে দলটির নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। রোববার সরেজমিন দেখা যায়, দলটির নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১ ঘণ্টায় ২১টি জীবনবৃত্তান্ত জমা পড়েছে। অনেকেই এসেছেন বিভিন্ন জেলা থেকে। তাদের অনেকেরই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই। কেউবা বিএনপি পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কারও কারও জীবনবৃত্তান্তে এমপি-মন্ত্রীদের সুপারিশ সংযুক্ত করতে দেখা গেছে। তবে আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের ভূমিকার বিষয়ে জীবন্তবৃত্তান্তে উল্লেখ করতে পারেননি।
তেমনই একজন ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিনের রেনু ফেরদাউস। রাজধানীর একটি কলেজে শিক্ষকতা করেন তিনি। বোরহানউদ্দিন উপজেলা মহিলা দলের সদস্য দাবি করলেও যথাযথ তথ্য-উপাত্ত দেখাতে পারেননি। নয়াপল্টনে দপ্তরে সংযুক্ত এমন একজন যুগান্তরকে বলেন, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে নারী মনোনয়নপ্রত্যাশীরা নয়াপল্টন কার্যালয়ে জীবনবৃত্তান্ত জমা দিচ্ছেন। দলের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনায়ই এসব জীবনবৃত্তান্ত জমা নেওয়া হচ্ছে। তবে বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা এবং বিগত সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন কি না-এসব জমা নেওয়ার সময় যাচাই-বাছাই করা হয় না।
এদিকে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কেউ কেউ যাচ্ছেন দলের গুলশান কার্যালয়ে, কেউবা শীর্ষ নেতাদের বাসায়। আবার অনেকে সচিবালয়ে গিয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন। বিএনপি ছাড়াও দলটির শুভাকাঙ্ক্ষী বলে পরিচিত বিভিন্ন পেশাজীবী নারীরাও তাদের জীবনবৃত্তান্ত পাঠাচ্ছেন এবং বিভিন্ন জায়গায় তদবির করছেন। কে, কবে কোথায় বিএনপির জন্য কাজ করেছেন-সেসব অবদানের কথা তুলে ধরছেন তারা। বিগত সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন না, কিংবা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের পদ-পদবিতে নেই-এমন অনেকেও জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, তফসিল ঘোষণার পর সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে পুরোদমে কাজ শুরু করবেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। ইতোমধ্যে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন তারা। আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, দলের প্রতি আনুগত্য এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা-এসবই হতে পারে মূল্যায়নের মানদণ্ড। এছাড়া বিএনপির মিত্র দলগুলোকেও দু-একটি নারী আসন ছাড় দিতে পারে দলটি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে দলের হাইকমান্ড থেকে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র এক সদস্য যুগান্তরকে বলেন, তফসিল ঘোষণা হলে এ বিষয়ে দলীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হবে। শনিবার রাতে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এমনটাই জানানো হয়। প্রাথমিকভাবে আমরা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু করেছি। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের কার্যালয় এবং নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দল ও অঙ্গসংগঠনের নেত্রীরা। এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটিসহ কেন্দ্রীয় নেতা ও সংসদ-সদস্যদের বাসায় ধরনা দিচ্ছেন তারা। মন্ত্রীদের সুপারিশের জন্য সচিবালয়ে গিয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। কেউ আশ্বস্ত হচ্ছেন, কেউবা নিরাশ হয়ে ছুটছেন এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে।
এদিকে নারী আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা ও দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দলের কাছে রাজনৈতিক স্বীকৃতি চাইছেন তারা। অনেকেই বলছেন, শুধু পরিচয়ের রাজনীতি নয়, মাঠের অবদানও বিবেচনায় আসুক। পরিবারতন্ত্রের বাইরে থেকে উঠে আসা নেত্রীদের যোগ্যতা ও সংগ্রামের যথাযথ মূল্যায়ন হবে-এমনটাও প্রত্যাশা তাদের।
জাতীয় সংসদে ৫০টি নারী আসন সংরক্ষিত রয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, যে দল সাধারণ আসনে যতটি আসন পায়, সেই অনুপাতে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়। নিয়মানুযায়ী প্রতি ৬টি আসনের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত আসন পাওয়া যায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছে। দলটির মিত্র গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও গণসংহতি আন্দোলন একটি করে আসন পেয়েছে। এছাড়া সাতটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। প্রাথমিক বণ্টন অনুযায়ী, বিএনপি জোট ৩৬টি, স্বতন্ত্ররা মিলে একটি সংরক্ষিত আসন পেতে পারেন।
জানা যায়, এবার সংরক্ষিত নারী আসনে আলোচনায় রয়েছেন-বিএনপির কেন্দ্রীয় নেত্রী শিরিন সুলতানা, মহিলা দলের বর্তমান সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, সিনিয়র যুগ্মসম্পাদক হেলেন জেরিন খান, সহসভাপতি নাজমুন নাহার বেবী, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেত্রী শাম্মী আক্তার, সাবেক এমপি নিলোফার চৌধুরী মনি, সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, রাশেদা বেগম হীরা, রেহেনা আক্তার রানু, ইয়াসমিন আরা হক, জাহান পান্না, বিলকিস ইসলাম ও ফরিদা ইয়াসমিন।
এছাড়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পরাজিত ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, সাবিরা সুলতানা ও সানজিদা ইসলাম তুলিও আছেন আলোচনার তালিকায়। কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, রিজিয়া পারভীন ও কনকচাঁপা এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসিমউদ্দিন মওদুদ, প্রয়াত মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের মেয়ে ব্যারিস্টার সালিমা বেগম অরুনি, ড. আব্দুল মঈন খানের মেয়ে মাহরীন খান, বিএনপির সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরীর নামও আলোচনায় আছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী হাসিনা আহমদ ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সহধর্মিণী রুমানা আহমেদ, বিএনপির সাবেক মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পুত্রবধূ খাদিজাতুল কোবরা সুমাইয়া, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, বিএনপি নেত্রী অপর্ণা রায়, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মরহুম শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হুসাইন, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক শামীমা আক্তার রুবী সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন।
এছাড়া অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, মহিলা দলনেত্রী শাহানা আক্তার সানু, অ্যাডভোকেট শাহিনুর বেগম সাগর, মহিলা দলের সহ-স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ, নেওয়াজ হালিমা আরলী, রাবেয়া আলম, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস, ময়মনসিংহ জেলা মহিলা দলের সভাপতি তানজিন চৌধুরী লিলি, ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আরা ঊর্মি, বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি, ময়মনসিংহ জেলা মহিলা দলের সহসভাপতি ফাহসিনা হক লিরা, সাবেক সহসভাপতি সুলতানা জেসমিন (জুঁই), মহিলা দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব নাসিমা আক্তার (কেয়া), সাবেক সাধারণ সম্পাদিকা শামসুন্নাহার ভূঁইয়া, ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী সেলিনা সুলতানা নিশিতা, বর্তমান আহ্বায়ক রেহানা আক্তার শিরিন, খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক রোকেয়া চৌধুরী, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রোখসানা খানম, আয়েশা সিদ্দিকা, বিএনপির সংসদ-সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর সহধর্মিণী সাবিনা ইয়াসমিন, লুৎফুজ্জামান বাবরের স্ত্রী তাহমিনা জামান শ্রাবণী, বিএনপির ক্ষুদ্র ঋণবিষয়ক সম্পাদক এমএ কাইয়ুমের সহধর্মিণী শামীম আরা বেগম, ঝিনাইদহের মাহবুবা রহমান শিখা এবং প্রয়াত নাসির উদ্দিন পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনার নামও আছে আলোচনায়।
সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া যুগান্তরকে বলেন, বিগত সময়ে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছি। অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। এখন দল বিবেচনা করবে সংরক্ষিত আসনের মানদণ্ডে আমি আছি কি না। তবে যারা রাজপথে ছিলেন, দলের জন্য ত্যাগ আছে; তাদের সংরক্ষিত আসনের জন্য মনোনীত করলে ভালো লাগবে।
অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ যুগান্তরকে বলেন, ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে সম্মুখসারিতে ছিলাম। বিস্ফোরকসহ একাধিক মামলার আসামি হয়েছি। দুঃসময়ে যারা দলের জন্য রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন, আমরা তাদেরই জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনে দেখতে চাই।
রেহানা আক্তার শিরিন যুগান্তরকে বলেন, দলের ক্রান্তিকালে রাজপথে সামনের সারিতে থেকে আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। বহুবার হামলা-মামলার শিকার ও কারাবরণ করেছি। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে ভূমিকা রেখেছি। ২৮ অক্টোবরের পর দীর্ঘদিন রাজপথে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করেছিলাম। ২০২৪ এর রাজপথে আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে ভূমিকা রেখেছি। এখনো দেশ ও মানুষের জন্য ন্যায়ের পক্ষে সক্রিয় আছি।
শামীমা আক্তার রুবী যুগান্তরকে বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে দেশে-বিদেশে নানা কর্মসূচি পালন করেছি। ফ্যাসিবাদের চিত্র আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরেছি। ঢাকার রাজপথের আন্দোলনে সম্মুখসারিতে লড়েছি। গণ-অভ্যুত্থানে জীবনবাজি রেখে প্রতিদিনই কর্মসূচি সফল করেছি। আমার প্রত্যাশা, দল এবার মূল্যায়ন করবে।

