জাতীয় নেতাদের স্মরণে কার্পণ্য করলে ইতিহাস ক্ষমা করবে না: প্রধানমন্ত্রী
বাসস
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বৃহস্পতিবার স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান -পিআইডি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আমরা যদি হীন দলীয় স্বার্থে আমাদের ইতিহাসের জাতীয় নেতাদের ভূমিকাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে কার্পণ্য করি, তাহলে ভবিষ্যতে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। আমি বিশ্বাস করি, ঐতিহাসিক সত্য মেনে নিতে দ্বিধাচিত্ত থাকা হীনম্মন্যতার পরিচায়ক। ‘জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা’-শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এমন উক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের মত-পথ ভিন্ন হতে পারে, আমাদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্ক-বিরোধ থাকতে পারে; কিন্তু আমাদের মধ্যকার বিতর্ক-বিরোধ যেন শক্রতায় রূপ না নেয়। বৃহস্পতিবার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধে বীর শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরও বলেন, যাদের আত্মত্যাগে আমাদের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ; মুক্তিযুদ্ধে যারা আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন-তাদের প্রতি আমাদের গভীর ভালোবাসা। তাদের উদ্দেশে বলতে চাই-আপনাদের সাহসী ভূমিকা এখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের জন্য প্রেরণা। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ-এভাবে দেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে যারা জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন-তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, চলতি বছর স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক এবং পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেছে। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, নারীশিক্ষাসহ দেশগঠনে অসামান্য অবদানের জন্য আমার মরহুমা মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও এ বছর মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন। স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত সব গুণী এবং প্রতিষ্ঠানকে আন্তরিক অভিনন্দন এবং মোবারকবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশ এবং জনগণের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে আপনাদের এই অবিস্মরণীয় অবদান বাংলাদেশকে করবে সমৃদ্ধ। আজ এবং আগামীর বাংলাদেশে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসব অবদান প্রেরণার উৎস হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে আপনাদের অবদান এবং সফল কর্মগুলো অদূরভবিষ্যতে বিশ্বদরবারেও সমাদৃত হবে।
বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, দুর্নীতি, দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো আর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনজীবনে শান্তি, নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে আমাদের সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও কর্মমুখী করা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে এক বিশালসংখ্যক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী রয়েছে। কর্মক্ষম এ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করাই এ মুহূর্তের বড় চ্যালেঞ্জ।
পুঁথিগত পরিবর্তনের চেয়ে মানসিকতার পরিবর্তন বেশি জরুরি উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বিএনপির সরকার যতবার রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে, বারবার এর প্রমাণ দিয়েছে। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার সবকিছু স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের সব দেশে তেল-ডিজেলের দাম বাড়ানো হলেও জনদুর্ভোগ বিবেচনায় বর্তমান সরকার দাম বাড়ায়নি। এ খাতে প্রতিদিন শতকোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে হলেও সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।
এর আগে জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের ১৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’ পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ মরণোত্তর সম্মাননা পেয়েছেন সাতজন। ‘স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও নারীশিক্ষাসহ দেশ গঠনে’ সার্বিক অবদানের জন্য খালেদা জিয়াকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। অন্যরা হলেন-মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য মেজর মোহাম্মদ আবদুল জলিল, সাহিত্যে ড. আশরাফ সিদ্দিকী, সমাজ সেবায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও মাহেরীন চৌধুরী, সংস্কৃতিতে বশির আহমেদ এবং জনপ্রশাসনে কাজী ফজলুর রহমান।
প্রথমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মরণোত্তর পুরস্কার গ্রহণ করেন তার নাতনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে তিনি ‘দাদু’র পদক গ্রহণ করেন। মেজর জলিলের পক্ষে তার মেয়ে ব্যারিস্টার সারা জলিল, ড. আশরাফ সিদ্দিকীর পক্ষে তার মেয়ে ড. তাসনিম আরিফা সিদ্দিকী, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর পক্ষে তার ছেলে বারীশ হাসান চৌধুরী, মাহেরীন চৌধুরীর পক্ষে তার স্বামী মনসুর হেলাল, বশির আহমেদের পক্ষে তার মেয়ে হুমায়ারা বশির এবং কাজী ফজলুর রহমানের পক্ষে তার কন্যা তাবাসুম শাহনাজ পুরস্কার গ্রহণ করেন। এছাড়া বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে অধ্যাপক ড. জহুরুল করিম, সংস্কৃতিতে একেএম হানিফ (হানিফ সংকেত), ক্রীড়ায় জোবেরা রহমান (লিনু), সমাজ সেবায় সাইদুল হক, গবেষণা ও প্রশিক্ষণে মোহাম্মদ আবদুল বাকী, অধ্যাপক ড. এমএ রহিম, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া এবং পরিবেশ সংরক্ষণে আবদুল মুকিত মজুমদার (মুকিত মজুমদার বাবু) স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করেন।
এবার স্বাধীনতা পুরস্কারে মনোনীত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো-মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ, চিকিৎসা বিদ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পল্লী উন্নয়নে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), জনসেবায় এসওএস শিশু পল্লী ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ লে. কর্নেল আদনান কবির, ঢাকা মেডিকেল কলেজের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান, এসওএস শিশু পল্লীর ন্যাশনাল ডাইরেক্টর ড. এনামুল হক এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সিনিয়র প্যারামেডিক বিউটি রানী সাহা পুরস্কার গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী জোবাইদা রহমান এবং খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ-সদস্য, বিচারপতি, তিন বাহিনী প্রধান ও ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।
উল্লেখ্য, স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ১৮ ক্যারেটের ৫০ গ্রামের একটি স্বর্ণপদক, পদকের একটি রেপ্লিকা, তিন লাখ টাকা ও সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়।
