বরিশালে পুকুরে শতবর্ষী গজার
মানুষ আর মাছে নীরব বোঝাপড়া
মনিকা চৌধুরী, বরিশাল
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার ধানডোবা গ্রামে ‘গজার মাছের পুকুর’ পাড়ে দর্শনার্থীরা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গ্রামের নিরিবিলি পরিবেশে একটি পুকুর, আর সেই পুকুরজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বড় বড় গজার মাছ। এই মাছগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো-এগুলো মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই ভেসে ওঠে ঘাটের কাছে চলে আসে। কেউ খাবার দিলে নির্ভয়ে এগিয়ে এসে নেয়। আবার কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় পানির গভীরে। অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, বরিশালের গৌরনদী উপজেলার ধানডোবা গ্রামে নিত্যদিনের এই দৃশ্য আকর্ষণ করছে দর্শনার্থীদের। বার্থী ইউনিয়নের এই পুকুরটি এখন সবার কাছে পরিচিত ‘গজার মাছের পুকুর’ নামে। প্রতিদিনই এখানে ভিড় করেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। কেউ কৌতূহলবশত, কেউবা এখানে আসেন শুনতে পাওয়া গল্পের সত্যতা যাচাই করতে। আবার অনেকেই আসেন একটু সময় কাটাতে, এই ব্যতিক্রমী দৃশ্য কাছ থেকে দেখতে।
এই পুকুরের গল্প শুধু বর্তমানের নয়, ছড়িয়ে আছে প্রায় এক শতাব্দীজুড়ে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ওয়াছেল ফকির নামের এক ব্যক্তি প্রথম এই পুকুরে গজার মাছ ছাড়েন। তিনি ছিলেন সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর একজন ভক্ত এবং নিয়মিত মাজারে যাতায়াত করতেন। একসময় মাজারের খাদেমের কাছ থেকে এক জোড়া গজার মাছ নিয়ে এসে নিজের পুকুরে ছেড়ে দেন। সেই দুই মাছের বংশবিস্তার হয়ে আজ পুরো পুকুরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে গজারের দল।
এই পুকুরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অলিখিত নিয়ম। এখানকার মাছ কেউ শিকার করে না। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই চর্চার কারণে মাছগুলো মানুষের প্রতি ভীত নয়, বরং সহজেই ঘাটে চলে আসে। যেন মানুষ আর মাছের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক নীরব বোঝাপড়া।
লোকবিশ্বাসও এখানে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অনেকেই এই পুকুরে এসে মানত করেন। কেউ অসুস্থতা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় মাছকে খাবার দেন, কেউ আবার পুকুরে গোসল করেন। তাদের বিশ্বাস, আন্তরিক প্রার্থনা করলে মনের ইচ্ছা পূরণ হয়।
ওয়াছেল ফকিরের পুত্রবধূ আশি ছুঁইছুঁই রহিমুন নেছা বলেন, এই মাছগুলো আমাদের কাছে শুধু মাছ নয়, এটা আমাদের ইতিহাস। ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে এই বাড়িতে যখন এসেছি, তখন থেকেই দেখে আসছি কেউ এগুলো ধরে না, খায়ও না। ওরা ওদের মতোই বংশবৃদ্ধি করছে। ডাক দিলেই চলে আসে। তাই সবাই এগুলোকে আপন মনে করে। আমার শ্বশুর হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ভক্ত ছিলেন। মূলত তার নির্দেশেই এই পুকুরে ২টি গজার মাছ ছাড়া হয়। এরপর থেকে মাছগুলো এই পুকুরেই আছে। বন্যায় সব তলিয়ে গেলেও এই মাছ এই পুকুর ছেড়ে কোথাও যায় না!
ধানডোবার এই পুকুর তাই এখন আর শুধুই একটি জলাশয় নয়। এটি একদিকে যেমন কৌতূহলের কেন্দ্র, অন্যদিকে লোকবিশ্বাস ও ঐতিহ্যের ধারক। প্রকৃতি, ইতিহাস আর মানুষের বিশ্বাস-সব মিলিয়ে ‘গজার মাছের পুকুর’ হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত গল্প, যা প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষকে টেনে আনে নিজের কাছে।
