Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

বন্ডের অপব্যবহার

দশ মাসে ১৩০০ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি

Advertisement

সাদ্দাম হোসেন ইমরান

সাদ্দাম হোসেন ইমরান

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দশ মাসে ১৩০০ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি

Advertisement

গত ১০ মাসে ৬২টি বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের গুদামসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৩০০ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে ঢাকার দুই বন্ড কমিশনারেট। একই সময়ে ১৪০০ প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানির চিত্র অডিট করে আরও ২৭৫ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি উদ্ঘাটন করা হয়। পরে সেসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৯২ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্ড সুবিধা অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃত শুল্ক ফাঁকির পরিমাণ আরও ৫০ গুণ বেশি। এ কারণে স্থানীয় ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প দাঁড়াতে পারছে না। তবে বন্ড কর্মকর্তারা বলছেন, লজিস্টিক ও জনবল সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না। অডিট কার্যক্রমেও দেখা দিচ্ছে ধীরগতি।

ঢাকার দুই বন্ড কমিশনারেটে লাইসেন্সভুক্ত ৪ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান আছে। এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রকার ফেব্রিক্স বা কাপড় আমদানি করে। এর মধ্যে রয়েছে-নিট ফেব্রিক্স, ওভেন ফেব্রিক্স, ডেনিম ফেব্রিক্স, মেস ফেব্রিক্স। এছাড়া বিভিন্ন প্রকার সুতা যেমন-কটন, পলিস্টার, নাইলন ও ভলকানাইজড রাবার। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকার রংয়ের মধ্যে রয়েছে- প্রিন্টিং ইংক, সিনথেটিক অর্গানিক ডাইস, সালফার, বেস কালার। প্যাকেজিং আইটেমের মধ্যে রয়েছে-কাগজ, ডুপ্লেক্স বোর্ড, পলি প্রোপাইলিন বা পিপি, গামটেপ, এডহেসিভ টেপ, টিস্যু পেপার, আর্টকার্ড, কার্ড বোর্ড। টেক্সটাইল সংক্রান্ত কেমিক্যাল আইটেমের মধ্যে আছে- এমিনো সিলিকন অয়েল, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, কস্টিক সোডা, ফিনিশিং এজেন্ট, অ্যাসিটিক অ্যাসিড। লবণ আইটেমের মধ্যে- ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট, সোডিয়াম সালফেট, রেসিস্ট সল্ট; বিভিন্ন প্রকার লেবেলিং আইটেম এবং অন্যান্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে-ইলাস্টিক, হ্যাঙ্গার, জিপার, বাটন, ব্লেজার বা জ্যাকেট তৈরির কাঁচামাল। বন্ড সুবিধায় যা আমদানি করা হয়।

জানা গেছে, অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী ঢাকা দুই বন্ড কমিশনারেটে জনবল ও গাড়ির স্বল্পতা রয়েছে। ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে মোট অনুমোদিত জনবল ২২০ জন। কর্মরত আছেন ১৩০ জন। প্রিভেন্টিভ কার্যক্রমে নিয়োজিত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্বল্পতা প্রকট। একই অবস্থা ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই বন্ডের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, বন্ডের ফাঁকি রোধে লজিস্টিক ও জনবল সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তা সত্ত্বেও অডিট-প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম চালানোয় অনেক কর্মকর্তা ক্ষমতাসীনদের চক্ষুশূল হয়েছে। কর্মকর্তাদের নানাভাবে হেয় করা হয়। এ কারণে অনেকে প্রিভেন্টিভ কার্যক্রমে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তারা আরও বলেন, সরকারি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে ইসলামপুর ও পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক বন্ড সিন্ডিকেটের তথ্য উঠে এলেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে সেখানে অভিযান চালানো যায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়ে চোরাকারবারিরা সতর্ক হয়ে যায়। আবার কারখানা পর্যায়ে অকস্মাৎ অভিযান চালানোর মতো লজিস্টিক দুই বন্ডের কোনোটিতেই নেই। সব মিলিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বন্ডের কার্যক্রম।

সূত্র জানায়, ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট ৩০টি প্রিভিন্টেভ করে এক হাজার ৯২ কোটি টাকা এবং এক হাজার ২২টি প্রতিষ্ঠান অডিটের মাধ্যমে ১৬৬ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি উদ্ঘাটন করে, যা থেকে আদায় হয়েছে ৫৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট ৩২টি প্রিভিন্টেভ করে ২০৩ কোটি টাকা এবং ৩২৯টি প্রতিষ্ঠান অডিট করে ১০৯ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে। যা থেকে আদায় হয়েছে ৩৯ কোটি টাকা।

রপ্তানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্ডের অপব্যবহার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা বন্ড সুবিধায় আনা পণ্য খোলা বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে ও স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের ফলে দেশে ব্যবসার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে আসা পণ্যের সঙ্গে দেশীয় পণ্য প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় অনেক দেশীয় কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে কাস্টমস কর্মকর্তারা সব ব্যবসায়ীকেই সন্দেহের চোখে দেখেন। স্বনামধন্য অনেক প্রতিষ্ঠানকেও একই কারণে তারা মনিটরিংয়ের নামে হয়রানি করে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারি পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বন্ড ফাঁকির আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, বন্ড সুবিধার কাপড়, সুতা ও অন্যান্য সামগ্রী চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ট্রাকে করে নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে খালাস হয়। এছাড়া অসাধু ব্যবসায়ীরা চিটাগাং রোডের কাছে বিভিন্ন বাড়িকে অস্থায়ী গোডাউন বানিয়ে সেখানে বন্ড সুবিধার কাঁচামাল মজুত করে। সুবিধামতো সময়ে সেখান থেকে রাজধানীর ইসলামপুর, সদরঘাটের বিভিন্ন মার্কেটে চলে যায়। যার মাধ্যমে অসাধু বন্ডেড প্রতিষ্ঠান সরকারের শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম