Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড : ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

ধনী হওয়ার আগেই ‘বুড়ো’

Advertisement

Icon

আরমান হেকিম

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ধনী হওয়ার আগেই ‘বুড়ো’

Advertisement

বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন এক ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই জনসংখ্যার গঠন নিয়ে সামনে এসেছে এক গভীর সতর্কবার্তা। দীর্ঘ ৫১ বছরের জনমিতিক সুযোগের জানালা দ্রুত বন্ধ হয়ে আসছে। আর সেই সুযোগ যথাযথ কাজে লাগাতে না পারায় ‘ধনী হওয়ার আগেই বুড়ো হয়ে যাওয়ার’ ঝুঁকির মুখে পড়ছে দেশ।

সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রণীত পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন কৌশলপত্রে এ চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে এটির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। কৌশলপত্র অনুযায়ী, ১৯৮২ সালে শুরু হওয়া ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এই সময়কাল ২০৩৩ সালে শেষ হয়ে যাবে। অর্থাৎ, হাতে রয়েছে আর মাত্র ৭ বছর। এরই মধ্যে এই সুযোগের প্রায় ৮০ শতাংশ সময় পার হয়ে গেছে। ২০২৬ থেকে ২০৩০ এই পাঁচ জনমিতিক সুবিধাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের ‘শেষ বাস্তবসম্মত সুযোগ’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ বেল্লাল হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী থাকলেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা পাওয়া যায় না; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। ২০৩৩ সালে ডিভিডেন্ড শেষ হয়ে যাবে। এ নিয়ে এখন নতুন করে আলোচনার খুব বেশি অর্থ নেই। ডিভিডেন্ডের যাত্রা শুরু হয়েছে ১৯৮২ সালে, তাহলে এতদিন আমরা কী করেছি? বাস্তবে বাংলাদেশে এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে ২০০০ সালের পর থেকে। ফলে আমরা অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছি। তবে ডিভিডেন্ড শেষ হওয়া মানে এই নয় যে কর্মক্ষম মানুষের সমাপ্তি ঘটবে। সঠিক নীতির মাধ্যমে বয়স্ক জনগোষ্ঠীকেও উৎপাদনশীল রাখা সম্ভব। এজন্য স্বাস্থ্য ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সুস্থ থাকলে মানুষ ৬৫ বছরের পরেও কাজ করতে পারেন। বর্তমান প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়নে এখনই বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

তিনি বলেন, ধনী হওয়ার আগেই দেশ বৃদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে-এটি এক অর্থে ঠিক আছে। কারণ আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের যে সুবিধা সেটি শেষ হয়ে যাচ্ছে। বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২০৩৩ সালের পর বেড়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ৬২.১ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১০ কোটি ২৬ লাখ মানুষ কর্মক্ষম বয়সসীমায় রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেই বেকারত্বের হার ২৮ শতাংশের বেশি, যা শ্রমবাজার ও শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে গভীর অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে ‘লার্নিং পোভার্টি’র উচ্চ হার। লার্নিং পোভার্টি হলো-শিক্ষার্থীরা কী পড়েছে সেটা বুঝতে না পারা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ৫৩ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে তারা শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও উৎপাদনশীলতা কম থাকে। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ‘অব্যবহৃত শ্রম আয়’র হিসাবেও। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এই আয় ৪২ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ৪২১ বিলিয়ন টাকা বা ৩ লাখ ৪২ হাজার ১০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যার বড় অংশই তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ।

অন্যদিকে, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে সীমাবদ্ধ। যেখানে কাজের নিরাপত্তা, আয় ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতি তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না। এমন প্রেক্ষাপটে সামনে এসেছে আরেকটি বড় চাপ-দ্রুত জনসংখ্যার বার্ধক্য। বর্তমানে দেশে ৬৫ বছরের বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ (প্রায় ১ কোটি)। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৪ কোটিতে।

অর্থাৎ, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

এই দ্বিমুখী চাপ-একদিকে তরুণদের বেকারত্ব ও অদক্ষতা, অন্যদিকে দ্রুত বার্ধক্যের দিকে ধাবিত জনসংখ্যা বাংলাদেশকে একটি জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে হলে আগামী পাঁচ বছরে অন্তত ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু বর্তমান প্রবণতা সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। নীতিনির্ধারকরা এই সংকট উত্তরণে বেশ কিছু কৌশল প্রস্তাব করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করা, ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার হার ২৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালু করা। পাশাপাশি শিল্প খাতের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয় বাড়াতে ‘ইন্ডাস্ট্রি অ্যাডভাইজরি বোর্ড’ গঠনের কথাও বলা হয়েছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে রপ্তানি-চালিত প্রবৃদ্ধিকে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যদি বছরে ১০ শতাংশ হারে রপ্তানি বৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায়, তবে কর্মসংস্থান ১৬.৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একইভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে পারলে কর্মসংস্থান বাড়তে পারে আরও ৯.৪ শতাংশ। এর বাইরে সৃজনশীল ও ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং গ্রামীণ শিল্পভিত্তিক ক্লাস্টার গড়ে তোলার মতো নতুন ক্ষেত্রেও তরুণদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ‘ইয়ুথ গ্রিন কর্পস’ গঠনের মাধ্যমে জলবায়ু মোকাবিলায় কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরির কথাও বলা হয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়েই রয়েছে বড় প্রশ্ন। অতীতে কারিগরি শিক্ষার বিস্তার, শ্রমবাজারের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ কিংবা বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো বহু লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। ফলে নতুন করে নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোও একই পরিণতির মুখে পড়বে কিনা, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

জানতে চাইলে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন যুগান্তরকে বলেন, পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশল পরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে এবং জুনে অনুমোদন হতে পারে। শুরুতে আমরা ধারণা করেছিলাম ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা ২০৩৩ সাল পর্যন্ত থাকবে। তবে পরবর্তীতে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই সুবিধা ২০৪০ সাল পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে। ডিভিডেন্ডের এই সময়সীমা শেষ হলে অর্থনীতিতে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। সেগুলো মোকাবিলায় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে, রোবোটিক্সে অগ্রসর হতে হবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম