|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর মিরপুরে সন্তানদের চরম অনাদর-অবহেলায় এক মমতাময়ী মায়ের ট্র্যাজিক মৃত্যু দাগ কেটেছে সবার মনে। মৃত্যুর ৪ থেকে ৫ দিন পর তার শরীরে পচন ধরে। সেই অবস্থায় ৭৫ বছর বয়সি নূরজাহান বেগম নামের এই মায়ের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এক ছেলে যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক, মেয়েও শিক্ষক-এমন প্রতিষ্ঠিত একাধিক সন্তান থাকতেও শেষ বয়সে অবহেলা আর অনাদরে মরতে হলো এই মাকে। গত দেড় বছরে একটিবারের জন্যও খবর নেননি নূরজাহান বেগমের দুই ছেলে। এ ঘটনার পরই আলোচনায় এসেছে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ’ আইনটি। শেষ বয়সে বাবা-মার খাওয়া-দাওয়া, পোশাক, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধা নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে এ আইনটি পাশ হয়। যেখানে বলা হয়েছে, সক্ষম ও সামর্থ্যবান সন্তানরা তাদের অভিভাবকদের ভরণপোষণ নিশ্চিত করবেন। সন্তান ভরণপোষণ না দিলে আদালতে মামলা করতে পারবেন বাবা-মা। ২০২৩ সালে এ আইনের বিধিমালাও করা হয়। আইন লঙ্ঘনকারী সন্তানের সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। জরিমানা অনাদায়ে বা অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় ৩ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। কিন্তু এমন আইনও নূরজাহান বেগমের মতো বয়োবৃদ্ধ বাবা-মায়েদের সুরক্ষা দিতে পারছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাবা-মার ভরণপোষণ আইন প্রয়োগে অনীহা রয়েছে। ফলে কোনো কাজেই আসছে না আইনটি।
আইনজ্ঞরা বলেন, ভরণপোষণ না পেয়েও অধিকাংশ বাবা-মা সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা করতে চান না। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের সমাজে বহু বাবা-মা ভরণপোষণ পাচ্ছেন না। দিনের পর দিন মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অথচ মানসিক নির্যাতনকে আইনে অপরাধ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আইনে এটাকে অপরাধ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। আবার এই আইনে সাজার পরিমাণও একেবারেই কম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সামাজিক প্রবীণ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে ধীরে ধীরে প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ছে। ছেলেমেয়েরা তাদের দায়িত্ব নিচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনটির কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। আইনটি সম্পর্কে পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন, ফেসবুকের মাধ্যমে সবাইকে অবহিত করতে হবে যে, সন্তানদের তার বাবা-মাকে দেখাশোনা করতেই হবে। না হলে আইনে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা আছে। তিনি আরও বলেন, বাবা-মাকেও ছেলেমেয়ের সঙ্গে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সচিব হও-এসব বলার পাশাপাশি বৃদ্ধ হলে তাদের দেখাশোনা করার বিষয়টিও বলতে হবে।
আইনজ্ঞরা বলছেন, ভরণপোষণের এ সমস্যা আইন দিয়ে সমাধান করা যাবে না। শুধু আইন থাকলেই সমাজ থেকে বাবা-মার প্রতি অবহেলা দূর হয় না। শাস্তির ভয় দেখিয়ে নয়, পরিবারে নৈতিক শিক্ষার প্রসার এবং প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলার মাধ্যমেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক যুগান্তরকে বলেন, অনেক সামাজিক সমস্যা আছে, যার সমাধান আইন দিতে পারে না। উন্নত বিশ্বে, অনেক উন্নয়নশীল দেশেও বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখাশোনা ও ভরণ-পোষণের দায়িত্ব রাষ্ট্র পালন করে। এখন আইন করে আপনি জোর করে কাউকে ভরণ-পোষণ করাতে পারবেন না। সমাধানটা অন্য জায়গায় খুঁজতে হবে। এই আইনের ১২ বছর হয়ে গেছে কিন্তু প্রয়োগ হয়নি। অর্থাৎ আইন এখানে অচল। এটা আইনের দোষ না, আমরা আইনের মাধ্যমে ভুল সমাধানের দিকে এগিয়েছি।
ভরণপোষণ আইনে যা আছে : প্রত্যেক সন্তানকে তার বাবা-মার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বাবা-মার একাধিক সন্তান থাকলে সেক্ষেত্রে সন্তানরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে তাদের ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করবে। এই ধারার অধীনে বাবা-মার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে বাবা-মার একইসঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সন্তান তার বাবা বা মাকে বা উভয়কে তার, বা ক্ষেত্রমতো, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, কোনো বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদা-আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করবে না।
প্রত্যেক সন্তান তার বাবা এবং মার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করবে। বাবা বা মা কিংবা উভয়ই সন্তানের থেকে পৃথকভাবে বসবাস করলে, সেক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে নিয়মিতভাবে তার, বা ক্ষেত্রমতো, তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে। কোনো বাবা বা মা কিংবা উভয়ে, সন্তানদের সঙ্গে বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করলে, সেক্ষেত্রে উক্ত বাবা বা মার প্রত্যেক সন্তান তার দৈনন্দিন আয়-রোজগার, বা ক্ষেত্রমতো, মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ বাবা বা মা, বা ক্ষেত্রমতো, উভয়কে নিয়মিত দেবে।
আইন না মানলে যে শাস্তির বিধান রয়েছে : আইন লঙ্ঘনকারী সন্তানের সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। জরিমানা অনাদায়ে বা অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় ৩ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া কোনো সন্তানের স্ত্রী, বা ক্ষেত্রমতো, স্বামী কিংবা পুত্র-কন্যা বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় ব্যক্তি বাবা-মার বা দাদা-দাদির বা নানা-নানির ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধা দিলে বা অসহযোগিতা করলে তিনিও উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন গণ্যে উল্লিখিত দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
সূত্র বলছে, আইনে এমন শাস্তির বিধান থাকলেও বাস্তবতা বলছে, অনেক সন্তান বাবা-মার ভরণপোষণ তো দিচ্ছেই না, উলটো তাদের নির্যাতন করছে। নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা থাকলেও বেশির ভাগ বাবা-মাই আদালতের দ্বারস্ত হন না। তাছাড়া এই আইনের অধীন অপরাধকে জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য বলা হয়েছে। বাবা-মাকে মানসিক নির্যাতন করা অপরাধ হিসাবে আইনে স্পষ্ট করা হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে সালিশ-বিচার হয়, তবে সেসব সালিশে বাবা-মা তেমন ফল পান না। আবার আইনটি সম্পর্কে অনেক বাবা-মা জানেনও না। কারণ, বাবা-মার ভরণপোষণ আইনটি সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন প্রচার-প্রচারণা নেই। ক্ষেত্রবিশেষে আইন জানলেও নিজ সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না বাবা-মা।

