Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

পলাশবাড়ীতে ৪০ কোটি টাকার রামমন্দির

হরিদাস পালের অর্থের উৎস নিয়ে উত্তেজনা

গাইবান্ধায় বিশেষ আইনশৃঙ্খলা সভা, রামমূর্তি নির্মাণ স্থগিত

Icon

সিদ্দিক আলম দয়াল, গাইবান্ধা

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

হরিদাস পালের অর্থের উৎস নিয়ে উত্তেজনা

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা ডোম থেকে কোটিপতি বনে যাওয়া হরিদাস পালের আর্থিক উত্থান এবং ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও গুঞ্জন চলছে।

স্থানীয়রা বলছেন, অতিদরিদ্র হরিদাস পাল (৪০) স্থানীয় বাজারে অনেক দোকানে চাল-ডাল ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাকি রেখে অভাবের তাড়নায় ভারতে চলে যান। সেখান থেকে দেশে এসে মন্দিরসহ প্রায় শতকোটি টাকার অবকাঠামো গড়ে তোলেন। সবাই বলছেন-ভারতের দেওয়া টাকায় তিনি এই মন্দির গড়ে তুলেছেন। যদিও তা অস্বীকার করেছেন তিনি।

এদিকে উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে মন্দির নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং নিরাপত্তায় এলাকায় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। দরিদ্র হরিদাস পালের কোটি টাকার উৎস ও মন্দির নির্মাণ নিয়ে তোলপাড় গাইবান্ধা জেলাজুড়ে।

জেলার সনাতনী নেতারাও তার টাকার উৎস জানতে চান এবং তাকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার বিকালে পলাশবাড়ী মন্দির ভবনে সংবাদ সম্মেলন ডেকে রামমূর্তি নির্মাণ কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন মন্দির কমিটির নেতারা। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে ও সম্ভাব্য সহিংসতা এড়াতে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসন বৃহস্পতিবার দুপুরে সামাজিক সম্প্রীতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় বিশেষ সভা করেছে।

সভায় গাইবান্ধা সদরের এমপি মো. আব্দুল করিম, পলাশবাড়ীর এমপি মওলানা নজরুল ইসলাম লেবু, সুন্দরগঞ্জের এমপি মাজেদুর রহমান, গোবিন্দগঞ্জের এমপি শামীম কায়সার লিংকন ও জেলা বিএনপির সভাপতি টেলিফোনে সভায় বক্তব্য রাখেন।

এছাড়া গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লাহ, পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুন্নবী টিটুল, গাইবান্ধা জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুজন প্রসাদ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতা চঞ্চল সাহা, বিপুল কুমার দাস, বড় মসজিদের ইমাম মুফতি মাহমুদুল হক, হেফাজতে ইসলামের নেতা মুফতি মওলানা আব্দুল বাছেত, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মওলানা জহুরুল ইসলাম, গাইবান্ধা ইমাম উলামা পরিষদের সভাপতি মাহমুদুল হাসান কাসেমী, জুলাইযোদ্ধা দিসব রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক খাদেমুল ইসলাম খুদিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারি কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা সভায় সরাসরি উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন।

বক্তারা বলেন, ডোম সম্প্রদায়ের হরিদাস পালের রামমূর্তি নির্মাণকাজ আপাতত বন্ধ রেখে টাকার উৎস খুঁজে বের করতে হবে। এত টাকা তিনি কোথায় পেলেন তা সরকারের জানতে হবে।

সভায় বক্তারা হরিদাস পালের কোটিপতি হওয়ার কাহিনি খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ। এ দেশে হিন্দু-মুসলমানসহ জাতিধর্মনির্বিশেষে সবাই ভাই ভাই। আমরা মিলেমিশে বাস করি। কিন্তু হরিদাস পালের মতো ‘প্রতারক ও বাটপারদের’ কারণে সনাতনীরাও বিপাকে পড়েন। কাজেই তার কর্মকাণ্ডের ওপর নজর দিতে হবে। মন্দির নির্মাণের অর্থ কোথা থেকে আসছে তা সরকার খতিয়ে দেখছে। এখানে আতঙ্কিত হওয়ায় কিছু নেই।

এদিকে হরিদাস পাল এবং তার উপদেষ্টা স্যামল কুমার মোহন্ত বৃহস্পতিবার বিকালে পলাশবাড়ী মন্দির ভবনে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। স্যামল কুমার মোহন্ত বলেন, আমাদের আচরণে কেউ অসন্তুষ্ট হলে আমরা ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। সমাজের ও দেশের মানুষের কথা ভেবে আজ বিকাল থেকে রামমূর্তি নির্মাণকাজ স্থগিত করা হলো।

এর আগে বুধবার রামমন্দির নির্মাণের অর্থের উৎস ও রামমূর্তি অপসারণের দাবিসহ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা প্রশমনে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে ৮ দফা স্মারকলিপি দিয়েছে গাইবান্ধা ইমাম উলামা পরিষদ ও হেফাজতে ইসলাম। স্থানীয় শিক্ষক নাইম ইসলাম বলেন, ‘এসব টাকা আসছে ভারত থেকে। গোপনভাবে দেওয়া হচ্ছে। এই টাকা দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে মূর্তি।’

পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের কোমরপুরের মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা হরিদাস পাল তরনীদাস। অভাবের সংসারে অন্যের শূকরের পাল প্রতিপালন করতেন এবং বাঁশের ডালি কুলা চালুন তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতেন। কয়েক বছর আগে দুবলাগাড়ি এলাকার চাল ব্যবসায়ী আতাউর রহমানের কাছ থেকে নেওয়া কয়েক মন চালের টাকা বাকি রেখে হঠাৎ হাওয়া হয়ে যান তিনি।

পরে জানা যায়, হরিদাস ভারতে চলে গেছেন। কয়েক বছর ভারতে থেকে আবার চলে আসেন গাইবান্ধায় তার বাড়িতে। এরপর শুরু হয় তার আর্থিক উত্থান। ২০২০ সালে এসেই রামচন্দ্রপুর মুচান্নিদহ খাল ও শ্মশানের পাশে ৭৬ শতাংশ দেবোত্তর সম্পতি জুড়ে গড়ে তোলেন কালীমন্দির। শুরু করেন পূজা। কিছুদিনের মধ্যে তিনি বিশাল কালীমন্দির, গুরুকুলের আশ্রম, সেতু, কৃষ্ণ বিগ্রোহসহ বিশাল এলাকাজুড়ে ১৪৪টি দেবদেবীর প্রতিমা মন্দির গড়ে তোলেন। মন্দিরের চারপাশজুড়ে বড় বড় দালানকোঠা, খাবার ঘর, থাকার হোটেল নির্মাণ করেন।

২০২২ সালের ৭ নভেম্বর প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের প্রটোকল অফিসার পরিচয় দিয়ে স্বার্থ হাসিলের অভিযোগে হরিদাস পালকে ঢাকার বনানী থেকে এনএসআই গ্রেফতার করে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .