Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে করছাড়

শিল্পের সুরক্ষায় সাহসী পদক্ষেপ

Advertisement

Icon

আরমান হেকিম

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শিল্পের সুরক্ষায় সাহসী পদক্ষেপ

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাওয়া ছিল করছাড় ও ভর্তুকি প্রণোদনা কমিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি। তবে সরকার সেই পথে হাঁটেনি। আইএমএফ-এর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান চাঙা করতে ঢালাওভাবে করছাড় দিয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় আমদানি পণ্য ও সেবায় শুল্ক কিছু ক্ষেত্রে দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে। এত ছাড় দেওয়ার পর সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় কীভাবে অর্জিত হবে, সেটা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। যদিও করের আওতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে, সেটা কীভাবে অর্জন হবে-এর ‘সুস্পষ্ট রোডম্যাপ’ নেই।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় শিল্প সুরক্ষায় নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা জানান তিনি। 

প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে একাধিক ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। ওয়াশিং মেশিন ও ওভেন উৎপাদনে ব্যবহৃত ফ্লোট গ্লাস আমদানির ওপর আরোপিত ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। দেশীয় ফ্লোট গ্লাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পাঁচটি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ২৫ থেকে কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ শতাংশ। সিনথেটিক ওভেন ফ্যাব্রিক্স আমদানিতে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। ডিটারজেন্টের কাঁচামাল লিনিয়ার অ্যালকাইল আমদানিতে শুল্ক নামিয়ে আনা হয়েছে মাত্র ১ শতাংশে । রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে টায়ার-টিউব শিল্পের দুটি কাঁচামাল আমদানিতে। স্কিন কেয়ার ও বিউটি প্রোডাক্টস খাতে ব্যবহৃত দুটি কাঁচামালের সম্পূরক শুল্ক ৩০ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। শিল্প উৎপাদনের অন্যতম প্রধান বাধা বিদ্যুৎ খাতে বাড়ানো হয়েছে প্রণোদনা। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আমদানিতে শুল্ক সুবিধা ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ খাতে আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

ঢাকা চেম্বর অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, জটিল বিধিবিধান, বহুমুখী অনুমোদন ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়ে আসছে। এবারের বাজেটে এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তবে এই বাজেটের সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করবে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতার ওপর। কারণ বাজেটে যে ব্যয় পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য সাকারের পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এটি সহজ কাজ নয়। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। 

দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে বিভিন্ন পণ্যের আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। জিপসাম বোর্ড ও শিট শিল্পের সুরক্ষায় ২০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। পিভিসি ও পেট রেজিন আমদানিতে শুল্ক ৫ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১০ শতাংশ। বাইসাইকেল যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং অতিরিক্ত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ওয়াশিং মেশিন আমদানিতে। দেশীয় কাগজশিল্প রক্ষায় গ্রিজ প্রুফ পেপার ও গ্লাসিন পেপারের আমদানি শুল্ক ১০ থেকে ২৫ এবং অতিরিক্ত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। কোল্ড-রোল্ড কয়েল ও শিট আমদানিতে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক বসানো হয়েছে। কপার তার ও কপার টিউব আমদানিতেও শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। ডিসি মোটর আমদানিতে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ভ্যাটের আওতা বাড়াতে ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে মূসক নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। হিমায়িত মাছ ও সুগন্ধি বৃক্ষ নির্যাস আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। 

নগদ প্রণোদনার অগ্রিম আয়কর ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে রপ্তানি খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। তবে সরকার প্রায় ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাবে। তৈরি পোশাক খাতসহ প্রায় ৪৩ খাতে বর্তমানে রপ্তানি প্রণোদনা দেওয়া হয়। এসব খাতে প্রণোদনার হার শূন্য দশমিক ৩০ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। অবশ্য রপ্তানি আয়ের বিপরীতে উৎসে কর আগের মতোই এক শতাংশ রাখা হয়েছে।

কাস্টমস ও আয়করের আপিল ও ট্রাইব্যুনালে রাজস্ব সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার জন্য স্বীকৃত কর-দায়ের ১০ শতাংশ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে আপিল করতে হয়। ব্যবসা সহজীকরণের অংশ হিসাবে এ অর্থ কমিয়ে আনা হয়েছে। ১ জুলাই থেকে আয়কর ও মামলার ক্ষেত্রে স্বীকৃত কর-দায়ের ৫ শতাংশ এবং ভ্যাট কাস্টমসের মমলার ক্ষেত্রে স্বীকৃত কর-দায়ের ২ শতাংশ জমা দিয়ে আপিল করা যাবে। স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ভ্যাটমুক্ত রাখা হয়েছে। মোবাইল ফোন উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার ও টোনারের মতো প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের স্থানীয় উৎপাদনেও ভ্যাটছাড় অব্যাহত রাখা হয়েছে।

করপোরেট করহার ৫ বছরের জন্য অপরিবর্তিত রাখা হলেও ভবিষ্যতে করের আওতা বাড়িয়ে ধীরে ধীরে করহার কমানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে অগ্রিম কর ৫ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কর রেয়াত দেওয়া হয়েছে। যন্ত্রপাতি ভাড়ার ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকদের উৎসে কর ১৫ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। বিমা প্রিমিয়ামের ওপর উৎসে কর ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্ধেকে নামানো হয়েছে বিদেশি ঋণের সুদের ওপর কর। উৎসে করকে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর হিসাবে বিবেচনার বিধান বাতিল করে এটিকে অগ্রিম কর হিসাবে গণ্য করার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এসএমই খাতে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত রাখা হয়েছে। নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য এই সীমা ৭০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাইরে শিল্প স্থাপনে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ই-বাইক উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ তৈরিতে নিয়োজিত ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমদানি রেয়াত দেওয়া হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সব ধরনের শুল্ক, ভ্যাট ও আগাম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে।

Advertisement

Advertisement

ঘটনাপ্রবাহ: বাজেট ২০২৬-২৭


আরও পড়ুন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম