এতিম ও বাবা-মায়ের স্নেহবঞ্চিত শিশু নিবাস
৩৮৫ কোটি টাকার প্রকল্পে বড় অনিয়ম
Advertisement
আরমান হেকিম
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কাগজে-কলমে এটি ছিল এতিম ও বাবা-মায়ের স্নেহবঞ্চিত শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়। শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের একটি সরকারি উদ্যোগ। সেই শিশু নিবাস প্রকল্পে এখন দুর্নীতির বোঝা চেপে বসেছে। প্রতিষ্ঠান ঘিরে বেহিসাবি ব্যয়, নিয়মবহির্ভূত অর্থ ছাড় এবং কোটি কোটি টাকার অডিট আপত্তি। ৩৮৫ কোটি টাকার প্রকল্পে প্রায় ২১৭ কোটি টাকার অডিট আপত্তি পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ অডিট প্রতিবেদনেএ তথ্য উঠে এসেছে। তাতে প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা, কাজের অগ্রগতি যাচাই, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং কর-ভ্যাট আদায়ের প্রতিটি স্তরেই গুরুতর অনিয়মের চিত্র উঠে আসে।
অডিট অনুযায়ী, প্রকল্পের ৬৬ কোটি ৮২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা ব্যয়ের বিপরীতে কোনো বিল-ভাউচার বা প্রয়োজনীয় হিসাব-নথি নিরীক্ষা দলকে সরবরাহ করা হয়নি। অর্থাৎ এই বিপুল অঙ্কের টাকা কোথায়, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে, তার কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই। ফলে প্রকল্পের একটি বড় অংশের ব্যয় পুরোপুরি অস্বচ্ছ।
একইভাবে কাজের বাস্তব অগ্রগতি যাচাইয়ের মূল নথি মেজারমেন্ট বুক (এমবি) ছাড়াই ৫ কোটি ৫২ লাখ ৯২ হাজার ৯১৬ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এমবি না থাকায় প্রকৃত কাজের পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়নি। ফলে অর্থ ছাড়ের যৌক্তিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ।
অডিটে নির্মাণ খাতেও বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছে। তিনটি ভবনের মধ্যে দুটির কাজ সম্পন্ন না হলেও ১৩ কোটি ১৭ লাখ ১১ হাজার ৯৮ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। অন্যদিকে আরেকটি ক্ষেত্রে কাজের অগ্রগতির তুলনায় ৪ কোটি ৮৩ লাখ ১০ হাজার ৫৬৮ টাকা অতিরিক্ত বা আগাম পরিশোধের তথ্য মিলেছে। এতে দেখা যায়, কাজের অগ্রগতি যাচাই না করেই অর্থ ছাড় দেওয়া হয়।
ছোট খাতেও একই চিত্র। ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজ আংশিক সম্পন্ন হলেও পুরো কাজের বিপরীতে ২ লাখ ৯৪ হাজার ৩২৩ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী চেকের মাধ্যমে সরবরাহকারীকে অর্থ পরিশোধ না করে ২ লাখ ৪০ হাজার ৬৩৮ টাকা দেওয়া হয়েছে, যা সরকারি আর্থিক বিধির সরাসরি লঙ্ঘন।
ক্রয় প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। ১৪ লাখ ১৭ হাজার টাকার একটি ক্রয়ে দরপত্র মূল্যায়ন ও কোটেশন যাচাই যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এতে প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করছে অডিট কর্তৃপক্ষ।
প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বিতর্কিত অংশ হলো ১১৫ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ টাকার একটি কাজ। ভবন নির্মাণে অভিজ্ঞতা না থাকা একটি নৌযান নির্মাণ ও মেরামতকারী প্রতিষ্ঠানকে ডেলিগেটেড ওয়ার্কস পদ্ধতিতে এই কাজ দেওয়া হয়।
চুক্তিভিত্তিক অফিস ভাড়ার ক্ষেত্রেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। প্রকৃত আয়তনের চেয়ে বেশি স্পেস দেখিয়ে ভাড়া পরিশোধ করায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৫২০ টাকার আর্থিক ক্ষতি করা হয়।
প্রকল্পটির আর্থিক কাঠামো ও সময়সূচিও একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ২৯৬ কোটি ৭১ লাখ ৯১ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে ব্যয় বাড়িয়ে ৩৮৫ কোটি ২০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা করা হয়। মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে আবারও সময় বৃদ্ধি করে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। তবুও প্রকল্পের কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। বর্তমানে ১৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩টির নির্মাণ কাজ চলমান। পূর্ত কাজের অগ্রগতি ৭০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৬৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। প্রকল্প বাস্তবায়নের নেতৃত্বেও স্থিতিশীলতা ছিল না। এ পর্যন্ত চারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা হয়েছে। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের কাজের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সময়মতো বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তর ও খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ১৯টি উপজেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় এই প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে প্রকল্পটি এখনো অসম্পূর্ণ।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশিদ যুগান্তরকে বলেন, এটা প্রকিউরমেন্ট আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। কাজ শতভাগ শেষ হওয়ার আগে কোনোভাবেই বিল পরিশোধের সুযোগ নেই। এখানে যেটা হয়েছে তা অন্যায়। এতে অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। প্যানাল কোড অনুসারে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একটি প্রকল্পের মোট ব্যয়ের অর্ধেকের বেশি অডিট আপত্তি হওয়ার কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়।
চারবার পিডি পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পের চারবার পিডি পরিবর্তন কেন হয়েছে সেটা তদন্ত করে দেখা উচিত। কোনো কারণ ছাড়া এতবার পিডি পরিবর্তন হতে পারে না।
প্রকল্প পরিচালক বরকাতুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, প্রকল্পের বাস্তবায়ন দুই অংশে বিভক্ত। এক অংশ সমাজসেবা অধিদপ্তর করছে। অপর অংশ খুলনা শিপইয়ার্ড। খুলনা শিপইয়ার্ড মোট প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ২৯৬ কোটি টাকার কাজ করছে। আর ২১৬ কোটি টাকার যে অডিট আপত্তি এসেছে সেটা তাদের ব্যয়ের অংশ। সেখানে আমার বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের কোনো অনিয়ম নেই।
