সরকারের ব্যয় সংকোচন পরিপত্র উপেক্ষা
এটুআই’র টাকায় মন্ত্রীর পিএসের জর্জিয়া সফর
Advertisement
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) মুখলেছুর রহমান।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অ্যাসপায়ার টু ইনোভেটের (এটুআই) অর্থায়নে জর্জিয়া সফরে যাচ্ছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) মুখলেছুর রহমান। সরকারি অর্থায়নে বিদেশ সফর, প্রশিক্ষণ ও সেমিনারে অংশগ্রহণে কঠোর বিধিনিষেধ বহাল থাকার মধ্যেই এই সফরের আয়োজন করা হয়েছে।
সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যবহার না করে উন্নয়ন প্রকল্পের তহবিল থেকে ব্যয় দেখিয়ে একজন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তার বিদেশ সফর সরকারি নির্দেশনা এড়ানোর অভিনব কৌশল। নিয়মিত বদলিযোগ্য হওয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও প্রযুক্তিনীতি সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত আন্তর্জাতিক আয়োজনে মুখলেছুর রহমানের অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রকল্পের উদ্দেশ্য, প্রত্যাশিত ফলাফল এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন বা নীতিনির্ধারণের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিশেষজ্ঞদের পরিবর্তে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিদেশে পাঠানো প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সুবিধা দেওয়ার শামিল।
তাদের মতে, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রকল্পের অর্থ এভাবে ব্যয় করা হলে তা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং জবাবদিহির প্রশ্নকে আরও প্রকট করবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, এটি সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি ও সরকারি অর্থায়নে বিদেশ সফরের ওপর বিধিনিষেধের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্য, প্রয়োজনীয়তা এবং জনগণের অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এমন কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে পাঠানোর যৌক্তিকতা স্বচ্ছতার স্বার্থে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। জনগণের অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনস্বার্থ নিশ্চিত হওয়া উচিত।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২৩ থেকে ২৫ জুন জর্জিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য ‘এআই ইন গভর্ন্যান্স : ব্যালেন্সিং এফিসিয়েন্সি অ্যান্ড পাবলিক ইন্টারেস্ট’ শীর্ষক সম্মেলনে অংশ নেবেন মন্ত্রীর পিএস মুখলেছুর রহমান। আগামীকাল তার ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে। সফরের বিমান ভাড়া, আবাসন, ভাতা ও অন্যান্য ব্যয়সহ পুরো অর্থায়ন করা হচ্ছে আইসিটি বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্প ‘এটুআই’ থেকে।
যুগান্তরের হাতে আসা তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের (আইসিটি) সিনিয়র সহকারী সচিব সায়েম ইমরান স্বাক্ষরিত প্রশাসনিক আদেশ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৭ জুন সফরসংক্রান্ত জিও জারি করা হয়। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কেবিনেট সচিব, জনপ্রশাসন সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ১৮টি দপ্তরে এ আদেশ পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি সামনে আসার পর সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতি এবং বিদেশ সফরসংক্রান্ত বিদ্যমান পরিপত্রের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, সরকারের রাজস্ব ব্যয় কমানোর নির্দেশনা বহাল থাকলেও প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করে বিদেশ সফরের আয়োজন করা হলে সেই নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।
বর্তমান সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সরকারি অর্থায়নে সব ধরনের বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ আপতত সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য সব সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মকর্তাদের জন্য সব ধরনের বিদেশ সফর কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
আইসিটি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পের অর্থও শেষ পর্যন্ত জনগণের ট্যাক্সের টাকাই। রাজস্ব খাত থেকে ব্যয় করলে যদি নিষেধাজ্ঞা থাকে, তাহলে প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করে একই কাজ করাকে নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলতেই হবে।
এই সফরের যৌক্তিকতা নিয়ে খোদ প্রশাসনিক ও বিশেষজ্ঞ মহলেই প্রশ্ন উঠেছে। মুখলেছুর রহমান জনপ্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা, যিনি বর্তমানে মন্ত্রীর পিএস হিসাবে প্রেষণে কর্মরত রয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক ও কারিগরি সম্মেলনে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ আদতে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়মিত বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আজ যিনি আইসিটি মন্ত্রণালয়ে আছেন, কালই হয়তো তাকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কিংবা ভূমি মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হতে পারে।
এ বিষয়ে মুখলেছুর রহমান বলেন, আমি মন্ত্রীর সঙ্গে জর্জিয়া সফরে যাচ্ছি এবং সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। জিওতে এটুআইয়ের অর্থায়নের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে ভুলবশত, যা সংশোধন করা হবে বলে তিনি দাবি করেন। তবে সফরটি ইউএনডিপির আমন্ত্রণে হচ্ছে-এ দাবির পক্ষে কোনো আমন্ত্রণপত্র বা সংশ্লিষ্ট নথি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। ফলে সফরের প্রকৃত অর্থায়ন ও আমন্ত্রণের উৎস নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব (ভারপ্রাপ্ত) মামুনুর রশীদ ভূঞা যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি বিস্তারিত আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে কাল (রোববার) জানাতে পারব আশা করি।

