Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

সাত স্তম্ভের নতুন নকশা, তিন ধাপে বাস্তবায়ন

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে মহাপরিকল্পনা

Advertisement

এম শাহজাহান

এম শাহজাহান

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে মহাপরিকল্পনা

Advertisement

ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে আসতে দেশবাসীকে আরও অন্তত দুই বছর ধৈর্য ধরতে হবে বলে বার বার আশ্বস্ত করে আসছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার মতে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় এমন একটি অর্থনীতি পেয়েছে-যা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থা, স্থবির বিনিয়োগ এবং কমে যাওয়া কর্মসংস্থানের চাপে জর্জরিত। তাই অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে সময় লাগবে। এই সংকট মোকাবিলায় শুধু স্বল্পমেয়াদি নয়, একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরমূলক মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), পরিকল্পনা কমিশন, অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে আগামী পাঁচ বছরের জন্য যে অর্থনৈতিক রোডম্যাপ তৈরি হচ্ছে-সেটিই হতে যাচ্ছে আগামী এক দশকের উন্নয়ন কৌশলের ভিত্তি। এর লক্ষ্য শুধু বর্তমান সংকট কাটানো নয়, বরং অর্থনীতিকে নতুন কাঠামোয় পুনর্গঠন করা।

অর্থ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিনিয়োগ বাড়িয়ে আগামী কয়েক বছরে অর্থনীতির গতি পালটে দেওয়া হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘থ্রিআর’ কৌশল। এগুলো হলো-রিকভারি (Recovery), রেস্টোরেশন (Restoration) ও রিকনস্ট্রাকশন (Reconstruction)। অর্থাৎ প্রথমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, এরপর কাঠামোগত সংস্কার এবং সবশেষে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো বিনির্মাণ। আগামী পাঁচ বছরে তিন ধাপে এই কৌশল বাস্তবায়ন করা হবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে এ লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। বিশেষ করে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হলো-দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের গভীর সংস্কার, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়ন। পরিকল্পনার অভাব কখনো ছিল না। সমস্যা হচ্ছে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতা। ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব প্রশাসন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর সংস্কার ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন।’ তিনি বলেন, ‘যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে দুই-তিন বছরের মধ্যে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।’ মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘থ্রিআর কৌশল উপরের দিকে যাওয়ার তিনটি সিঁড়ি। এটা ঠিকই আছে।’ তিনি বলেন, ‘জিডিপি প্রবৃদ্ধি এখন সাড়ে ৩ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছুঁইছুঁই করছে এবং আর্থিক খাতের ফাউন্ডেশন পুরোপুরি ধসে গেছে। গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে অর্থনীতিতে লুটপাট চলেছে। দেশে এখন একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি বিরাজমান। এ অবস্থা থেকে অর্থনীতি টেনে তুলতে হলে থ্রিআর কৌশল বাস্তবায়নেও সরকারের মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।’

সাত স্তম্ভে দাঁড়াবে নতুন অর্থনীতি : সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রস্তুত করা নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়ায় সাতটি কৌশলগত স্তম্ভ নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো-এক. অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ-এতে ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেল থেকে বেরিয়ে বিভাগীয় শহর ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলা। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও সেবা খাতকে ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দুই. ডিরেগুলেশন বা বিনিয়ন্ত্রণ-বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে ‘ডিরেগুলেশন’। ব্যবসা শুরুর অনুমোদন, লাইসেন্স, কর নিবন্ধন, আমদানি-রপ্তানি অনুমোদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো হবে। তিন. বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি-দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চার. সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন-পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোতে বিশেষ অর্থনৈতিক কার্যক্রম, অবকাঠামো ও সামাজিক বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। পাঁচ. সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা-দারিদ্র্য, বৈষম্য ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ছয়. কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন-প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করা লাখো তরুণের জন্য দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত শিক্ষা এবং শিল্প-উপযোগী মানবসম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচি।

সাত. সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার-ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব প্রশাসন, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যেন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈষম্য হ্রাস এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রতিফলিত হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ হচ্ছে তরুণ জনগোষ্ঠী। দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত শিক্ষা এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ না বাড়ালে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী সামনে দুই বছর হবে পুনরুদ্ধারের সময়। এরপর শুরু হবে রূপান্তরের সময়। এই রূপান্তরের সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর। এগুলো হলো-সুশাসন, সংস্কার এবং তা বাস্তবায়ন।

তিন ধাপে বাস্তবায়ন : তিনি ধাপে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপ হলো-স্থিতিশীলতা (২০২৬-২৭)। এ ধাপের প্রধান লক্ষ্য হবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা হবে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান বজায় রাখবে। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, রিজার্ভ পুনর্গঠন এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়িয়ে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে মূল্যস্ফীতির ধাক্কা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। দ্বিতীয় ধাপ হলো-পুনর্গঠন ও সংস্কার (২০২৭-২০২৯)। এ সময় ব্যাংক খাত সংস্কার হবে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, আর্থিক খাতে সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সংস্কার বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল ট্যাক্স প্রশাসন এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধিও এই ধাপের মূল কর্মসূচি। আয়কর ই-রিটার্নের ন্যায় ভ্যাট রিটার্ন চালু, কাস্টমসের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, করনীতি ও কর ব্যবস্থাপনা পৃথকীকরণ এবং রপ্তানি সম্ভাবনাময় সব খাতকে কাস্টমস বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্তভাবে কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানির সুবিধা প্রদান। তৃতীয় ধাপ হলো-প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধি (২০২৯-২০৩১)। এই পর্যায়ে সরকার উচ্চমূল্য সংযোজিত শিল্প, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ফার্মাসিউটিক্যালস, তথ্যপ্রযুক্তি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে জোর দেবে। ডিজিটাল অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোও প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস হিসাবে বিবেচিত হবে। এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ধাপভিত্তিক কৌশলটি নীতিগতভাবে সঠিক। প্রথমে স্থিতিশীলতা, এরপর সংস্কার এবং সবশেষে প্রবৃদ্ধি এটাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের স্বাভাবিক পথ। তবে সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা অপরিহার্য। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক এবং নিম্ন রাজস্ব আহরণের সমস্যার সমাধান না হলে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

আইএমএফ কর্মসূচির প্রভাব : সরকারের সংস্কার পরিকল্পনার পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর চলমান কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সুশাসন, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছে। সরকারের নতুন অর্থনৈতিক রোডম্যাপের অনেকগুলো উপাদান এই সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া ডিজিটাল অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোও প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস হিসাবে বিবেচিত হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং বার্ষিক বাজেটের মধ্যে প্রায়ই সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। কিন্তু নতুন পরিকল্পনায় বাজেট বরাদ্দকে সরাসরি কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু প্রকল্প ব্যয় নয়, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ফলাফলও মূল্যায়নের আওতায় আনা হবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম