Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

ব্যাংক রেজুলেশন আইন সংশোধন

শুধু ফেরার পথ বন্ধ নয়, লুটেরাদের কঠোর শাস্তি জরুরি

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শুধু ফেরার পথ বন্ধ নয়, লুটেরাদের কঠোর শাস্তি জরুরি

Advertisement

ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিল করে লুটপাটে জড়িত পুরোনো মালিকদের ফেরার পথ বন্ধ করা হয়েছে। সোমবার জাতীয় সংসদে আইনটির সংশোধনী এনে ধারাটি বাতিল করা হয়। ওই ধারায় বলা ছিল, ‘পুরোনো মালিকরা সাড়ে ৭ শতাংশ শেয়ার কিনে ব্যাংকের মালিকানা ফেরত পাবেন।’ এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের বক্তব্য হলো, ‘শুধু ফেরার পথ বন্ধ করলে হবে না, জনগণের টাকা লুট করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশ-বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এনে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। তা-না হলে ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরবে না।’

এ প্রসঙ্গে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমডি শফিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংক লুটেরাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। ধীরে ধীরে সেই সম্পদ বিক্রি করে লুটের অংশ শোধ করতে হবে। এছাড়া লুটেরাদের জায়গা-জমি থাকলে একসঙ্গে সব বিক্রি না করা গেলে-প্রয়োজনে প্লট করে বিক্রি করতে পারে সরকার। সব মিলিয়ে তাদের নিঃস্ব করে ছাড়তে হবে। তাহলে সমাজে একটা বার্তা যাবে যে, দুর্নীতি করে পার পাওয়া যাবে না।’

বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ডিজি ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘ব্যাংক লুটেরা দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় না আনলে সাধারণ মানুষের মাঝে আস্থা ফিরবে না।’

বাজেট আলোচনায় সোমবার অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে সরকার রেজুলেশন আইনের ১৮(ক) ধারা বিলোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বার্তা স্পষ্ট, যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। আমানতকারীর স্বার্থ নিশ্চিত করা হবে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করা হয়। এর অধীনে ভয়াবহ সংকটে পড়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক-ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন ও এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটির ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে। এর বাইরে আমানত বিমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ধার হিসাবে দিয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এক্সিম ছাড়া বাকি চার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলমের হাতে। একীভূত হওয়া এই ব্যাংকগুলো ঋণের বড় অংশই আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করছে বিভিন্ন সংস্থা। এসব ব্যাংক থেকে পাচার করে বিভিন্ন দেশে গড়া সম্পদ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে ব্যাংকগুলো।

এদিকে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ কমিটি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা যে ৯৯টি অধ্যাদেশ হুবহু আইনে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এর একটি ছিল ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ। তবে আইনটি সংসদে ওঠার আগে শেষ সময়ে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করে বিএনপি সরকার। বিরোধী দল অভিযোগ করে, সরকার সমঝোতা ভেঙেছে। এই ধারার মাধ্যমে পুরোনো মালিকদের ফেরার পথ তৈরি হচ্ছে। এস আলম আবারও ফিরবে।

রেজুলেশন আইনের ১৮(ক) ধারায় বলা হয়, ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইন কিংবা এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় তালিকাভুক্ত হওয়ার আগের শেয়ারধারক অথবা শেয়ারধারকরা অথবা বাংলাদেশ ব্যাংক উপযুক্ত বিবেচিত ব্যক্তি ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ-দায় পুনঃধারণ বা ধারণ করিবার জন্য রেজুলেশন কর্তৃপক্ষ হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর আবেদন করিতে পারিবে।’ এই ধারার উপধারা (৩)এ বলা হয়-‘আবেদন চূড়ান্ত হওয়ার পর সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক যে পরিমাণ অর্থ দিয়েছে তার সাড়ে ৭ শতাংশের পে-অর্ডার দিতে হবে।’

জানা যায়, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরের আগে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আজিম উদ্দিন বিশ্বাসকে আহ্বায়ক করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সুপারিশ ছাড়াই নতুনভাবে যুক্ত করা হয় ১৮(ক) ধারা। আগের অধ্যাদেশে ব্যাংকের খারাপ অবস্থার পেছনে দায়ীদের আর কখনো মালিকানায় ফেরার সুযোগ ছিল না। এরকম ধারা যুক্ত করার পর আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা সরাসরি আপত্তি জানায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকেও এরকম ধারা বাতিলের অনুরোধ করা হয়।

আবার ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি, এমডিদের সংগঠন এবিবি এরকম ধারা যুক্ত করায় ব্যাংক খাতের আতঙ্কের বিষয়টি তুলে ধরে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণ ছিল এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। পুরো ব্যাংক খাতে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর ব্যাংকগুলোর মোট মূলধন ঘাটতির অর্ধেকের বেশি এই পাঁচ ব্যাংকে। ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে পাঁচ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম