Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

সরকার চায় রাষ্ট্রের ব্যয় কমাতে

এয়ারশো দেখতে বিদেশে বিমানের শীর্ষ ৫ কর্তা

যুক্তরাজ্যের ফার্নবরো প্রদর্শনীতে অংশ নিতে অর্ধকোটি টাকা ব্যয় * অতীতে বিমানের কর্মকর্তারা এমন সফরে গেলেও তাদের অভিজ্ঞতা কী কাজে লেগেছে, কেউ জানে না-কাজী ওয়াহিদুল আলম, এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ

Advertisement

সাইফ আহমাদ

সাইফ আহমাদ

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এয়ারশো দেখতে বিদেশে বিমানের শীর্ষ ৫ কর্তা

ফাইল ছবি

Advertisement

রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমাতে বিদেশ সফরে কড়াকড়ি আরোপ করেছে সরকার। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েরও নির্দেশনা রয়েছে। সেই নির্দেশনা বহাল থাকা অবস্থায়ই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) পাঁচ কর্মকর্তা একটি এয়ারশোতে অংশ নিতে সরকারি খরচে যুক্তরাজ্য সফরে গেলেন। এ সফরে ব্যয় হবে প্রায় অর্ধকোটি টাকা। সফরের প্রয়োজনীয়তা, অনুমোদন এবং যৌক্তিকতা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের আন্তর্জাতিক এয়ারশোতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কী অর্জন করবে, তার সুস্পষ্ট মূল্যায়ন থাকা উচিত। সফরের পর নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ সহযোগিতা কিংবা অন্য কোনো বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জিত হবে কি না, তার জবাবদিহি না থাকলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সরকার যখন সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য কৃচ্ছ্রসাধনের বার্তা দিচ্ছে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বড় প্রতিনিধিদল বিদেশ পাঠানো সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং জনমনে ভুল বার্তা যাচ্ছে বলেও মনে করেন তারা।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, এয়ারশোতে অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও অর্জনের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত। অতীতেও বিমানের কর্মকর্তারা প্যারিস ও ফার্নবরো এয়ারশোতে অংশ নিয়েছেন। তবে সেসব সফর থেকে সেবার মান উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, উড়োজাহাজ সংগ্রহ, রক্ষণাবেক্ষণ সহযোগিতা বা বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়ের বিষয় ছিল। তা যদি এবার দৃশ্যমান না থাকে তবে এ ধরনের সফরে সরকারি অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়বে। এগুলো অনেক সময় কর্মকর্তাদের জন্য ‘পেইড হলিডে’ বা রাষ্ট্রীয় খরচে প্রমোদভ্রমণ হিসাবে গণ্য হয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, এটি সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি ও সরকারি অর্থায়নে বিদেশ সফরের ওপর বিধিনিষেধের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এ ধরনের এয়ারশোতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্য, প্রয়োজনীয়তা এবং জনগণের অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, যুক্তরাজ্যে ফার্নবরো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারশো-২০২৬-এ অংশ নিতে ১৯-২৫ জুলাই পর্যন্ত ৭ দিনের সফরে রয়েছেন বিমানের পাঁচ কর্মকর্তা। সফরের পুরো ব্যয় বহন করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। সফরকারী কর্মকর্তা হলেন-বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ, পরিচালক (ফ্লাইট অপারেশনস) ক্যাপ্টেন একেএম আমিনুল ইসলাম, পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমোডর মো. মনজুর ই আলম, পরিচালক (করপোরেট প্ল্যানিং অ্যান্ড ট্রেনিং) এম মাসুদুর রহমান এবং করপোরেট প্ল্যানিং বিভাগের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ক্যাপ্টেন শেখ আব্বাস হোসেন।

সরকার ৬ এপ্রিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ, সরকারি ব্যয় হ্রাস এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারি অর্থায়নে বিদেশ সফর কঠোরভাবে সীমিত করার নির্দেশনা দেয়। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়, ‘একান্ত অপরিহার্য কারণ’ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নিরুৎসাহিত করতে হবে।

এরপর ৮ জুলাই অর্থ বিভাগ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আরও কঠোর পরিপত্র জারি করে উন্নয়ন ও পরিচালন বাজেটের আওতায় সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে সরকারি অর্থায়নে বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। অথচ এসব নির্দেশনার পরই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল সরকারি অর্থায়নে যুক্তরাজ্য সফরে গেলেন।

১৩ জুলাই ও ১৬ জুলাই জারি হওয়া বিমানের দুটি দাপ্তরিক চিঠিতে এই সফরের অনুমোদনের তথ্য পাওয়া গেছে। চিঠি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সফরে বিজনেস ক্লাস বা সমমানের বিমান ভাড়া, যুক্তরাজ্যে হোটেলে অবস্থান, দৈনিক ভাতা (ডিএ), স্থানীয় যাতায়াত এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়সহ পুরো ব্যয় বহন করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। সব মিলিয়ে এতে অর্ধকোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

এ ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব বা অনুমোদিত বাজেট প্রকাশ করা হয়নি বলে জানা গেছে। তবুও সংশ্লিষ্টদের মতে, ডলার সংকটের এই সময়ে এত বড় প্রতিনিধিদল পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

চলতি বছরের এপ্রিলেই যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে বিমানের নতুন উড়োজাহাজ কেনার গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পন্ন হয়। ফলে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ফার্নবরো এয়ারশোতে ৫ জন শীর্ষ কর্মকর্তার উপস্থিতি কতটা অপরিহার্য ছিল সেই প্রশ্নও তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। বিমানের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আন্তর্জাতিক এয়ারশোতে অংশ নেওয়া নতুন ব্যবসায়িক যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে চুক্তি বোয়িং কেনার চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর করপোরেট প্ল্যানিং থেকে একাধিক কর্মকর্তাসহ একই প্রতিষ্ঠানের এত বড় প্রতিনিধিদল পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট নয়।

প্রশ্ন উঠেছে এই সফর কি সরকারের ‘একান্ত অপরিহার্য’ বিদেশ সফরের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে? যদি না পড়ে, তাহলে কীসের ভিত্তিতে ৫ সদস্যের প্রতিনিধিদলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে? সফর শেষে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিমান কী ধরনের পরিমাপযোগ্য সুবিধা অর্জন করবে? আর যদি এটি নিয়মিত অংশগ্রহণই হয়, তাহলে কৃচ্ছ্রসাধনের নীতির ব্যতিক্রম হিসাবে এর অনুমোদন কে দিয়েছে?

এ বিষয়ে জানতে দফায় দফায় বিমান পর্যটনমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবকে যুগান্তর থেকে ফোনে কল করা হলেও তারা ধরেননি। তাদের হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠালেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম