রাজশাহীর ভবানীগঞ্জ দলিল লেখক সমিতির নির্বাচন
যুবলীগ নেতা শামীমকে পুনর্বাসনে বিএনপি জামায়াত একাট্টা
ছবি-যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নিষিদ্ধ যুবলীগের রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা যুগ্মসম্পাদক আসাদুল ইসলাম ওরফে শামীম মীর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের দলীয় দুই সাবেক সংসদ-সদস্যের (এমপি) ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এর মধ্যে টানা তিনবারের এমপি এনামুল হকের দেহরক্ষী হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এনামুল হকের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ভবানীগঞ্জ দলিল লেখক সমিতির দুই দফায় টানা আট বছর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শামীম। ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী আবুল কালাম আজাদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। ওই বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর প্রায় দুই মাস আগে এলাকায় ফিরেছেন তিনি।
শনিবার ভবানীগঞ্জ দলিল লেখক সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১১টি পদে ভোট হবে। শামীম সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাকে পুনর্বাসনে এখন বিএনপি-জামায়াত একাট্টা। তাকে পুনর্বাসিত করতে যাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টাতার অভিযোগ উঠেছে, তাদের অডিও ভয়েস যুগান্তরের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
দলিল লেখক সমিতির নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাঁতীদলের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সানাউল ইসলাম। তার প্যানেলেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন শামীম। অভিযোগ উঠেছে, সাধারণ সম্পাদক পদে বিজয়ী হতে শামীম তাঁতীদল নেতা সানাউলকে ‘ম্যানেজ’ করেছেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সানাউল বলেন, ‘নির্বাচনে কোনো প্যানেল নেই। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী।’
নির্বাচন করতে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিশন গঠন করা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার আব্দুল আজিজ ছাড়া কমিশনের বাকি চার সদস্যই আওয়ামী লীগ সমর্থক। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচনে বিশেষ কৌশলে যুবলীগ নেতা শামীমকে বিজয়ী করতে এ ধরনের কমিশন গঠন করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে মোবাইল ফোনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আব্দুল আজিজকে জিজ্ঞাসা করলে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের পাঁচ সদস্যের মধ্যে আমি জামায়াত সমর্থক। বাকি সবাই আওয়ামী লীগ। সবাই শামীম মীরকে সহযোগিতা করছেন।’
শামীমের বিরদ্ধে আওয়ামী লীগ আমলে ক্ষমতার প্রভাব খাটানো, সমিতির অর্থ আত্মসাৎ এবং দলিল লেখকের লাইসেন্স দেওয়ার নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, তার নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী ছিল এবং ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় তিনি সশস্ত্র হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। বর্তমানে তার ফেসবুক কার্যক্রমেও সরকারবিরোধী ও আওয়ামী লীগের পক্ষে বিভিন্ন প্রচারণা চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
দলিল লেখকের লাইসেন্স এবং সমিতির সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাসে শামীম ২০ থেকে ২২ জনের কাছ থেকে অন্তত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তাদের একজন বাগমারার তাহেরপুর পৌরসভা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি আইনুল হক। তিনি বলেন, ‘শামীম আমার কাছ থেকে তিন দফায় ৯ লাখ টাকা নিয়েছেন। আমি লাইসেন্স বা সমিতির সদস্য পাদ পাইনি। গত আট বছরে তিনি আমাকে এক টাকাও ফেরত দেননি।’ একই প্রতিশ্রতিতে শামীম বাগমারার ধামিন কামনগর এলাকার সুজনের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং সাবেক দলিল লেখক মৃত দেলবারের ছেলে মোস্তাফিজের কাছ থেকে সাত লাখ টাকা নিয়েছেন।
পুরোনো সাম্রাজ্য ফিরে পেতে শামীমকে সহযোগিতা করছেন আওয়ামী জমানায় তার বাহিনীর দুই সদস্য মাসুদ রানা রিগ্রেট ও শফিকুল ইসলাম হাজি। তারাও আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি এনামুলের ঘনিষ্ঠ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ভোল পালটে রিগ্রেট ও হাজি জামায়াত প্রার্থী ডা. আব্দুল বারীর পক্ষে নির্বাচনি প্রচারে নামেন। এখন দুজনেই এলাকায় বর্তমান এমপি আব্দুল বারীর সঙ্গে থাকেন। শামীমকে বিজয়ী করতে তারা কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন। রিগ্রেটের বিরুদ্ধে দলিল লেখক সমিতির সদস্যদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে রিগ্রেট বলেন, ‘আমি সাবেক এমপি এনামুলের সিকিউরিটি ইনচার্জ ছিলাম। শামীমও এনামুলের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখতেন। শামীমকে আমরা পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করছি না। আর শামীমের পক্ষে কোনো দলিল লেখককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। জামায়াতের এমপি আমার মামা। এ কারণে তার সঙ্গে থাকি।’ একই বিষয়ে বক্তব্যের জন্য শফিকুল ইসলাম হাজিকে ফোনে কল করা হলে তিনি ধরেননি।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, শামীমকে পুনর্বাসনে সহযোগিতা করছেন ভবানীগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি সাবেক মেয়র আব্দুর রাজ্জাক ও তার অনুসারী কয়েকজন। শামীম আব্দুর রাজ্জাক ও তার অনুসারীদের বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করেন।
শামীম সম্প্রতি উপজেলা সদরের দলিল লেখক সমিতি কার্যালয়ের মূল ফটকের সামনে তার মালিকানাধীন পাঁচতলা বাড়িটি আড়াই কোটি টাকায় সম্প্রতি বিক্রি করেছেন। বাড়ি বিক্রির টাকার লেনদেন বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে হয়েছে। বিনিময়ে আব্দুর রাজ্জাক নিয়েছেন ১০ লাখ টাকা।
অভিযোগ অস্বীকার করে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘শামীমকে পুনর্বাসিত করার প্রশ্নই আসে না। জামায়াতের ছত্রছায়ায় শামীম এলাকায় ফিরেছেন। তার বাড়ি বিক্রি থেকে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। যিনি বাড়ি কিনেছেন, তিনি আমার ঘনিষ্ঠ। এ কারণে ক্রেতাকে সহযোগিতা করেছি।’
অভিযোগ অস্বীকার করে শামীম মীর বলেন, ‘দল করার কারণে আমি দলের সাবেক দুই এমপির সঙ্গে ছিলাম। জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় আমি ছিলাম না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সমিতির তহবিল তছরুপ কিংবা কাউকে দলিল লেখকের লাইসেন্স দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছেন। তবে বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক ভাইয়ের বাড়িতে আমার বাড়ি বিক্রির টাকা লেনদেন হয়েছে। আর আমার নামের আইডিটি ফেক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আমি কোনো রাজনৈতিক পোস্ট করিনি।’
স্থানীয় এমপি জামায়াত নেতা ডা. আব্দুল বারী বলেন, ‘নির্বাচনের সময় আমার পক্ষে অনেকেই কাজ করেছেন। তাদের কেউ হয়তো শামীমের সঙ্গে মিশতে পারেন। তবে তারা জামায়াতের কেউ নন। শামীমের সঙ্গে আমার কোনোদিন দেখা হয়নি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দলের যুব সংগঠনের কেউ নির্বাচনে অংশ নেবেন এবং তাকে আশ্রয়-প্রশয় দেওয়া হবে, জামায়াত সেটি বরদাশত করবে না।’

