Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

গুলিবিদ্ধ শ্রমজীবী

১৮ অপারেশনেও হাঁটতে পারছেন না মেহেদী

রক্তাক্ত জুলাই

জাহিদ হাসান

জাহিদ হাসান

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

১৮ অপারেশনেও হাঁটতে পারছেন না মেহেদী

রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জুলাই আন্দোলনে আহত মেহেদী আলম -সংগৃহীত

বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টা। রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) অপারেশন থিয়েটার থেকে অস্ত্রোপচার শেষে বেডে নেওয়া হচ্ছিল বৈষম্যবিরোধী অন্দোলনে আহত যুবক মো. মেহেদী আলমকে।

ট্রলিতে শুয়ে থাকা এই জুলাই যোদ্ধা কেমন আছেন জানতে চাইলে কাঁপা কণ্ঠে বলেন, ‘আমার আর ভালো থাকা ভাই! কোনোরকমে বেঁচে আছি। গুলি লাগা পায়ে এবার নিয়ে ১৮তম অপারেশন হলো। কিন্তু গত দুই বছরেও স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সাধ পূরণ হলো না! গত ৭ জুলাই হঠাৎ পড়ে গিয়ে ভাঙা পায়ে আঘাত পেয়েছি। পায়ে ফের ইলিজারভ বসানো হয়েছে।’

চিকিৎসা পরিভাষায় ইলিজারভ (Ilizarov) হলো একটি বিশেষ অর্থোপেডিক চিকিৎসা পদ্ধতি, যা ক্ষতিগ্রস্ত বা ভাঙা হাড় পুনর্গঠন ও লম্বা করতে ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত শরীরের বাইরে ধাতব রিং এবং তারের সাহায্যে একটি ফ্রেম তৈরি করে ধীরে ধীরে হাড়ের বৃদ্ধি ঘটায়, যা জটিল হাড়ের সমস্যার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর।

২৮ বছরের যুবক মেহেদী আলম যুগান্তরকে জানান, অভাবের সংসারের হাল ধরতে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ২০১২ সালে শরীয়তপুর থেকে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় এসেছিলেন। আহত হওয়ার আগে রাজধানীর গুলশান-১-এ একটি ফুলের দোকানে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে কাজ করতেন।

চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের দমন-নিপীড়ন দেখে নিজেও আন্দোলনে যোগ দেন। অন্য দিনের মতো চব্বিশের ১৮ জুলাই রামপুরার বিটিভি ভবন এলাকায় আন্দোলনের সম্মুখভাগে ছিলেন। ওইদিন রাতে বিজিবি সদস্যদের ছোড়া বুলেট তার বাম পায়ের হাঁটুর নিচে হাড় ভেদ করে যায়। বুলেটের আঘাতে পায়ের ৬ ইঞ্চি পরিমাণ হাড় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

আহত হওয়ার পর প্রথমে সহযোদ্ধরা পশ্চিম রামপুরার বেসরকারি ‘ডেল্টা হেলথ কেয়ার হাসপাতালে’ নিলে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) পাঠানো হয়। পরিস্থিতি মারাত্মক হওয়ায় ঢামেক চিকিৎসকরা রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) রেফার করেন। পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তির পর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পায়ে ৬টি রড বসানো হয়।

পরে আরও কয়েকবার অস্ত্রোপচারের পর ‘ইলিজারভ’ যন্ত্র বসানো হয়। এভাবে গত বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত গুলি লাগা পায়ে ১২ বার অস্ত্রোপচার করা হয়। ওই সময় জানানো হয়েছিল হাড় জোড়া লাগার পর নার্ভ (স্নায়ু) ইনজুরির চিকিৎসা লাগবে। সবমিলে প্রায় দুই বছর চিকিৎসা নিতে হবে।

মেহেদীর বড় বোন ডালিয়া আক্তার বলেন, গত বছর ঈদুল আজহার সময় (জুনের প্রথম সপ্তাহে) ইলিজারভ পরানো অবস্থায় পঙ্গু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রিলিজ দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অক্টোবরে উন্নত চিকিৎসা নিতে সিএমএইচে নিয়ে এলে ইলিজারভ থেকে একটি রড খুলে দিয়ে ৩ মাস ভর্তি রাখে। এরপর পঙ্গু হাসপাতালে গেলে ১২ ডিসেম্বর চিকিৎসকরা সম্পূর্ণ ইলিজারভ খুলে শ্যামলীতে ব্র্যাকের ফিজিওথেরাপি সেন্টার/লিম্ব সেন্টারে পাঠায়। সেখানে ২ মাস ভর্তি রেখে ফিজিওথেরাপি দেয়।

থেরাপি নিয়ে মেহেদী ক্র্যাচ ছাড়াই কিছুটা চলাফেরা করতে সক্ষম হচ্ছিলেন। ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে চলতি বছরের মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। বাড়ি যাওয়ার কিছুদিন পর মেহেদী বিরল রোগ ‘গুলেনবারি সিনড্রোম (জিবিএস)’-এ আক্রান্ত হন। সম্পূর্ণ শরীর অবশ হয়ে যায়। স্থানীয় চিকিৎসকদের পরামর্শে দ্রুত আগারগাঁওয়ের জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নিয়ে এলে দুই মাস ভর্তি রেখে চিকিৎসা নেন। ওই সময় শরীরে ১৬ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে মাসিক কিছু সহায়তা পেলেও জিবিএস চিকিৎসার ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। ধারদেনা করে প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ জোগাতে হয়েছে। সরকারের কাছে আবেদন করলেও কোনো সহায়তা মেলেনি। সবশেষ পড়ে গিয়ে ভাঙা পায়ে ফের সমস্যা হয়েছে। ফলে ৭ জুলাই সিএমইচ ট্রমা সেন্টারে ভর্তি করি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন দীর্ঘ সময় ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে হবে।

ভরাট কণ্ঠে কান্না লুকানোর চেষ্টা করে মেহেদী আলম বলেন, চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থও হয়েছিলেন। একটু-আধটু হাঁটতেও পারতেন। আশা ছিল সম্পূর্ণ সুস্থ হলে ছোটখাটো কাজ শুরু করবেন। বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করবেন। কিন্তু তা আর হয়ে উঠছে না।

তার ভাষ্য, ‘জুলাই আন্দোলনে যারা মারা গেছেন, তারা দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করে দুনিয়া ছেড়েছেন। কিন্তু আমরা যারা আহত হয়ে পঙ্গু অবস্থায় কোনোরকমে বেঁচে আছি, আমাদের শরীর ও মনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা কোনোদিনও কোনো কিছু দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়। আমাদের ত্যাগের কারণে দেশ ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়েছে। নতুন সরকার এসেছে। সবকিছুই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কেবল আমার প্রাণভরে হাঁটাচলার সাধ পূরণ হয়নি।’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .